0 0 lang="en-US"> দক্ষিণ এশিয়ায় করোনার হালচাল - ভাষান্তর
ভাষান্তর

দক্ষিণ এশিয়ায় করোনার হালচাল

Read Time:9 Minute, 27 Second

ডা. আমির খান, আল জাজিরা ইংরেজি:

উহান থেকে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ভাইরাসটির এপিসেন্টার বা মূল কেন্দ্র দূরপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ইউরোপ-আমেরিকার নানা প্রান্তে স্থানান্তরিত হতে দেখা গেলো। এরপর ধনী দেশগুলো যখন নিজেদের এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্যে টিকার ব্যবস্থা করলো, তখনই করোনার এপিসেন্টারে পরিণত হলো দক্ষিণ এশিয়ার স্বল্পোন্নত দেশসমূহ।


ভারত

ভারতে দ্রুত ও গণহারে করোনা বৃদ্ধি পেতে দেখা গেলো। তারপনর ২০২০ সালজুড়ে দেশটিতে দফায় দফায় কোভিডের বাধা-নিষেধ সহজীকরণ হলো, এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা দিলেন যে, ভারত মহামারীর খেলার শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণার পরপর দেশজুড়ে বড় আকারের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সমাবেশের অনুমতি প্রদান শুরু হলো, এবং অনিবার্যভাবেই, কোভিডের প্রকোপ আবার বাড়তে শুরু হলো। ৩ মে ভারত করোনা আক্রান্ত সংখ্যার দিক থেকে ২০ মিলিয়নের ভয়ঙ্কর মাইল ফলক স্পর্শ করে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

ভারতে করোনার মূল ঝুঁকির কারণ ভাইরাসটির বি১.১.৭ সংস্করণ, যেটির উৎপত্তি হয়েছিল যুক্তরাজ্যে। করোনা ভাইরাসের এই রূপটি অনেক বেশি সংক্রামক এবং এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভারতে এসে ভাইরাসের এই রূপটি ছড়িয়ে পড়ার জন্য বিশাল জনগোষ্ঠীকে পেয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাজ্যের রূপটি ভারতে এসে আরো পরিবর্তিত হয়ে আরো ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে।

নতুন ভারতীয় “ডাবল মিউট্যান্ট” বা দুইবার পরিবর্তিত রূপটি বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে কারণ এটি আরও বেশি সংক্রামক বলে মনে করা হচ্ছে এবং এটি সম্ভবত টিকা ও পূর্ববর্তী সংক্রমণের দ্বারা প্রদত্ত সুরক্ষা থেকে পালিয়ে থাকতে সক্ষম।

তার উপর দেশটির কিছু সংখ্যক জনগণ টিকা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন। এরপরও ভারত বেশ আশা-জাগানিয়া টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরু করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও টিকার কাঁচামাল যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হয় বলে চাহিদা মতো টিকা প্রস্তুত করতে ভারত হিমশিম খাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে দেশটির জনসংখ্যার বড় একটি অংশ মারাত্মক বিপদে পড়েছে, দ্রুতই হাসপাতালসমূহে ভীড় বৃদ্ধি পাচ্ছে, মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্য পরিষেবা পর্যন্ত পাচ্ছে না। অক্সিজেন এবং ঔষধ যেন বিলাস দ্রব্যে পরিণত হচ্ছে, সেই সুযোগে ভারতীয় কালোবাজার ফুলে ফেপে উঠছে, তারা চওড়া দরে চিকিৎসা সামগ্রী বিক্রি করছে।

দুনিয়াজুড়ে বিভিন্ন দেশ নিজেদের স্বার্থেই ভারতকে সহযোগিতা করার ব্যাপারে রাজি হয়েছে, তবে তা হয়েছে দৈনিক ‍মৃত্যু হারের রেকর্ড করার পর।

বাংলাদেশ

ভারতের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ। এই দেশটিতেও ২০২০ সালের ধাক্কা তুলনামূলক কম লেগেছিল। কিন্তু এর ফলে দেশটির জনসাধারণ ভাইরাসটি সম্পর্কে এক ধরনের আত্মতুষ্টি অনুভব করতে শুরু করে এবং তারা সামাজিক দূরত্বও মেনে চলছিল না। মার্চ এবং এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে কোভিড আক্রান্ত বাড়তে থাকে, যে কারণে সরকার দেশজুড়ে বিভিন্ন ধরনের বাধা-নিষেধ আরোপ করে। এপ্রিলের ১৯ তারিখ বাংলাদেশে কোভিড সংক্রমণে ১১২ জন মৃত্যুবরণ করেন, যা দেশটির সর্বোচ্চ মৃত্যুহার। এপ্রিলের ১৪ তারিখ থেকে সর্বাত্মক লকডাউন আরোপ করা হয়।

পরিস্থিতির আরো অবনতি হচ্ছে দেখে সরকার লকডাউনের পাশাপাশি আরো অনেক বিধি-নিষেধ আরোপ করে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়, যে সকল দেশকে সরকার অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করেছে, সে সকল দেশে যাওয়া-আসাও নিষিদ্ধ করা হয়। কিছু কিছু এলাকার পরিকল্পিত নির্বাচনও স্থগিত করা হয়। টিকাকরণ প্রক্রিয়াধীন আছে, তবে অগ্রগতি হচ্ছে খুবই ধীর গতিতে। মাত্র ২.৮১ মিলিয়ন মানুষ টিকার উভয় ডোজ গ্রহণ করেছেন, এবং মোট ৮ মিলিয়ন মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ আশা করছে ভারতের দুর্গতি সীমান্ত অতিক্রম করবে না এবং দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে না। ভাইরাসটি যে কত মারাত্মক এবং বিধি-নিষেদ মেনে চলা কতটা জরুরি, জনগণকে তা বোঝানোর জন্য সরকার এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হবে।

পাকিস্তান

ভারতের পরিস্থিতি যে রকম করুণ, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশসমূহেও এখন কোভিড-১৯ সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সীমান্ত এলাকা সমূহে পাকিস্তানে কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধুমাত্র এপ্রিল মাসে পাকিস্তানে ১৪০,০০০ জন নতুন আক্রান্ত হয়েছেন, এবং মৃত্যু হয়েছে ৩,০০০ জনের।

পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা ২১ কোটির কিছু বেশি, যেখানে ভারতের জনসংখ্যা ১৩৭ কোটি। সেই পাকিস্তানের গত ২৮ এপ্রিল সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে, যেখানে মোট মৃতর সংখ্যা ২০১।

তার উপর মে মাসে ঈদু ফিতর। সাধারণত এ উপলক্ষে মানুষ অনেক বেশি কেনাকাটা এবং সামাজিক মেলামেশা করেন, যা উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। নাগরকিদেরকে তাই এ বছর সাদামাটা ও ছোটখাট পরিসরে উৎসব উদযাপনের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে।

নেপাল, আফগানিস্তান ও শ্রীলঙ্কা

এ অঞ্চলের তুলনায় নেপাল, আফগানিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় মার্চ অবধি ভাইরাসটি তুলনামূলক কম ছড়িয়েছে। বিভিন্ন অনুদানের সুবাদে দেশগুলো টিকাও পেয়েছে। এখন দেখার বিষয় ভারতে যে পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল, এসকল দেশে তার পুনরাবৃত্তি হয় কিনা।

বিভিন্ন দেশ ভারতে সহযোগিতা প্রেরণ করেছে, এবং পৃথিবীর এই অংশটিতে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি দেখার জন্য আগ্রহী হয়ে আছে। মহামারীকে পৃথিবীর কোন এক প্রান্তে আটকে রাখা যে কতটা অসম্ভব, তা আমরা দেখতে পেলাম। ৩ জন করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে ১ জনের ক্ষেত্রে কোন উপসর্গই দেখা যায় না। ফলে মানুষ এবং পণ্যের চলাচলের মাধ্যমে আবশ্যিকভাবে ভাইরাস সীমান্ত অতিক্রম করে।

এই রোগের বিস্তার রোধে স্থানীয় সরকারগুলি কী করবে তা আমাদের সকলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি বিশ্বব্যাপী মহামারী যা সর্বত্র শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন একটি অঞ্চল থেকে পুরোপুরি শেষ হবে না। এর ফলে হয়তো বিভিন্ন দেশ তাদের তাৎক্ষণিক স্বার্থকে পাশে রেখে অন্য দেশসমূহকে সহযোগিতা করবে এই মহামারী কাটিয়ে ওঠার জন্য।

 


আল জাজিরা ইংরেজির ওয়েবসাইটেWhere will the next COVID hotspots be?শিরোনামে প্রকাশিত ফিচারের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ ছবি আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত

Happy
0 0 %
Sad
0 0 %
Excited
0 0 %
Sleepy
0 0 %
Angry
0 0 %
Surprise
0 0 %
Exit mobile version