Tuesday, June 15, 2021
0 0
Homeশীর্ষ খবরআফগান শান্তিপ্রক্রিয়া সম্পর্কে তালিবান নেতার চিন্তাভাবনা

আফগান শান্তিপ্রক্রিয়া সম্পর্কে তালিবান নেতার চিন্তাভাবনা

Read Time:13 Minute, 16 Second


সিরাজুদ্দীন হাক্কানী, নিউ ইয়র্ক টাইমস
[তালিবানের উপপ্রধান নেতা সিরাজুদ্দীন হাক্কানীর কলাম ছেপেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস তালিবানের পক্ষ থেকে তিনি আসলে কী বলতে চাচ্ছেন? যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার একটি গণমাধ্যমই বা কেন একজন তালিবান নেতার বক্তব্য প্রচার করছে? এই কৌতুহল থেকে তালিবান নেতার কলামের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা হলো ভাষান্তরে]
২০১৮ সালে আমাদের প্রতিনিধিরা যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সাথে সংলাপ শুরু করেন, তখনই আমাদের বিশ্বাস ছিল যে এই আলোচনার ফলাফল হবে শূন্যের কাছাকাছি ১৮ বছর ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পর এবং ইতোপূর্বে সংলাপের কয়েকটি প্রচেষ্টা নিষ্ফল প্রমাণিত হওয়ার পর আমরা মার্কিন অভিপ্রায়ে আস্থা রাখতে পারছিলাম না
এরপরও আমরা আরেক বার চেষ্টা করে দেখার সিদ্ধান্ত নিই লম্বা যুদ্ধের ফলে সবাইকেই ভয়াবহ মূল দিতে হচ্ছিল আমরা ভাবছিলাম, সাফল্যের সম্ভাবনা যত কমেই হোক না কেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার যে কোন সুযোগকে বাতিল করে দেওয়াটা বোকামী চার দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন আফগানদের মূল্যবান প্রাণ হারাতে হচ্ছে প্রত্যেকেই যার যার ভালোবাসার কাউকে না কাউকে হারিয়েছে সবাই এখন যুদ্ধক্লান্ত আমি বিশ্বাস করি যে হতাহতের ঘটনা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিদেশি জোটের সাথে আমরা স্বেচ্ছায় যুদ্ধে জড়াই নি, বরং নিজেদেরকে রক্ষা করতে আমরা বাধ্য হয়েছিলাম কাজেই আমাদের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল বিদেশি সামরিক শক্তিকে আফগানিস্তানের মাটি থেকে প্রত্যাহার করা আমরা যে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি শান্তিচুক্তি সাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি, সেটা খুব ছোট কোন মাইল ফলক নয়
আমার সহকর্মী আব্দুল গনি বেরাদার শের মোহাম্মাদ আবাস স্তানেকজাই নেতৃত্বাধীন আামদের প্রতিনিধি দল মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাথে একটি চুক্তিকে সম্ভব করে তোলার জন্য গত ১৮ মাস ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে আলোচনা চলাকালে আমাদের গ্রামসমূহে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলাসহ নানা কারণে বিরক্ত হওয়া সত্ত্বেও আমরা আলোচনা চালিয়ে নিয়েছি
এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন আলোচনা বন্ধ করেছিলেন, তখনও আমরা শান্তির দ্বার উন্মুক্ত রেখেছিলাম, কারণ যুদ্ধের কারণে আমরা আফগানরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি পারস্পরিক সমঝোতা ছাড়া এ জাতীয় নিবিড় আলোচনার মাধ্যমে কোনও শান্তি চুক্তি হয় না। এমনকি আকাশ থেকে বৃষ্টির ন্যায় মৃত্যু বর্ষিত হওয়া সত্ত্বেও, যে শত্রুর সাথে আমাদের দুই দশকের যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা, তাদের সাথেই আলোচনা চালিয়ে গিয়েছি, শুধুমাত্র বৈরিতা নিরসনে ও নিজেদের দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের অঙ্গীকার প্রমাণ করার স্বার্থে।
বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানের সরকার ব্যবস্থা কি রকম হবে, এ নিয়ে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে এবং বাইরে যে উদ্বেগ ও প্রশ্ন রয়েছে, আমরা সে বিষয়ে সচেতন আছি এ বিষয়ে আমার মত হলো, আফগান জনগণের ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিষয়টি নির্ধারিত হবে প্রথম বারের মতো বিদেশি আধিপত্য ও হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত হওয়ার প্রকৃত সংলাপ প্রক্রিয়ার মধ্যে যেন আমাদের এই চিন্তা কোন বাধা সৃষ্টি না করে
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কেউ যেন এই প্রক্রিয়ায় আগে থেকে পূর্বনির্ধারিত ফলাফল এবং শর্ত আরোপ না করে আমরা নতুন, অন্তর্ভুক্তিমুলক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সকল দলের সাথে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ, যে ব্যবস্থায় প্রত্যেক আফগানের কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত হবে, এবং কেউই নিজেকে সেই ব্যবস্থার বাইরে মনে করবে না
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বিদেশি আধিপত্য ও হস্তক্ষেপ থেকে স্বাধীন হওয়ার পর আমরা এমন একটি ইসলামি ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবো, যাতে সকল আফগান সমান অধিকার লাভ করবে, যেখানে ইসলাম কর্তৃক অনুমোদিত নারীর অধিকার শিক্ষা থেকে শুরু করে কাজের অধিকার পর্যন্ত সুরক্ষা পাবে, এবং যেখানে যোগ্যতাই হবে সমান সুযোগ লাভেরভিত্তি 
বিপর্যয়কর বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বারা আফগানিস্তান ব্যবহৃত হওয়ার মাধ্যমে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা বিষয়ক যে উদ্বেগ, সে বিষয়েও  আমরা সতর্ক আছি কিন্তু এই উদ্বেগকে মূলত বাস্তবতার তুলনায় বড় করে দেখানো হচ্ছে যে সকল প্রতিবেদনে আফগানিস্তানে বিদেশি গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান সম্পর্কে বলা হচ্ছে, সেগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং উভয়পক্ষের যুদ্ধকামীদের অতিশয়োক্তিতে ভরা
কোন আফগান এরকম গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দিয়ে আমাদের দেশকে ছিনতাই করতে চাইবে না, এবং সেটাকে আবার যুদ্ধক্ষেত্র বানাতে চাইবে না বিদেশি দখলদারদের কারণে আমরা ইতিমধ্যে যথেষ্ট ভুগেছি আমরা অন্যান্য আফগানদের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবো, যাতে নয়া আফগানিস্তান স্থিতিশীলতার ঘাটি হতে পারে এবং আমাদের মাটিতে কেউ যেন কোন হুমকি অনুভব না করে আমরা এ বিষয়টি নিশ্চিত করবো
আমাদের সামনে থাকা অসংখ্য চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আমরা সচেতন আছি বিভিন্ন আফগান গোষ্ঠী যেন আমাদের একটি সার্বজনীন ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার জন্য আন্তরিকতার সাথে কঠিন পরিশ্রম করে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করাই সম্ভবত আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্চ আমি আত্মবিশ্বাসী, এটা সম্ভব আমরা যদি বিদেশি শত্রুর সাথে ঐকমত্যে পৌছাতে পারি, তাহলে অবশ্যই আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বসমূহ আলোচনা সাপেক্ষে সমাধান করতে পারবো
আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো, বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহারের পর শান্তির দিকে উত্তরণের সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইতিবাচকররূপে আমাদের সাথে সংযুক্ত করা এবং আগ্রহী করে তোলা স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা খুবই দরকার হবে
আমরা দীর্ঘমেয়াদী শান্তি-নির্মাণ ও পুনর্গঠনে আমাদের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে কাজ করতে প্রস্তুত। এমনকি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রও সেনা প্রত্যাহারের পরে আফগানিস্তানের যুদ্ধোত্তর উন্নয়ন এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে।
আমরা সব দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব স্বীকার করি এবং তাদের উদ্বেগসমূহকে গুরুত্বের সাথে নিই। আফগানিস্তান বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করতে পারে না। নতুন আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একজন দায়িত্বশীল সদস্য হবে।
যতক্ষণ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রীতিনীতিসমূহ ইসলামের মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, ততক্ষণ অবধি আমরা সেগুলো মেনে চলার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবো। এবং আমরা আশা করি অন্য দেশগুলো আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, এবং আমাদের দেশকে প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্বের বদলে সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করবে।
সবার আগে আমাদের সামনে যে চ্যালেঞ্জটি আসছে, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের চুক্তি কার্যকর করা মার্কিন মধ্যস্থদের সাথে কাতারের দোহায় সংলাপের মাধ্যমে একটি পর্যায়ের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র আমাদেরকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না, তাই আমরাও তাদেরকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা থেকে অনেক দূরে আছি এখনো
আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি চুক্তি সাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে আছি, এবং আমরার সেই চুক্তির প্রতিটি ধারা আক্ষরিক এবং চেতনাগত দিক থেকে পুরোপুরি পালন করার ব্যাপারে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ চুক্তির সম্ভাব্যত অর্জন, এটির সাফল্য নিশ্চিতকরণ ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রতিটি অঙ্গীকার যথাযথভাবে পালন করার উপর  কেবল এর পরই আমরা পূর্ণ আস্থা পাবো এবং সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপিত হবে, এমনকি ভবিষ্যতে অংশীদারিত্বও হতে পারে  
আমার আফগানবন্ধুরা খুব শিগগিরই এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি উদযাপন করবে একবার এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে তারা সকল বিদেশি সৈন্যের আফগানিস্তান ত্যাগ দেখতে পাবে আমরা যেহেতু এই মাইল ফলকে পৌছতে সক্ষম হয়েছি, আমি বিশ্বাস করি সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন আমরা সকল আফগান ভাইবোনেরা এক সাথে কাজ করবো, দীর্ঘস্থায়ী শান্তির দিকে এগিয়ে যাবো, এবং একটি নতুন আফগানিস্তানের ভিত্তি স্থাপন করবো
তারপর আমরা এক নতুন সূচনা উদযাপন করবো, যা সকল প্রবাসীদেরকে নির্বাসন থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের আমন্ত্রণ জানাবে, যে স্বদেশের অংশীদার আমরা সকলে, যেখানে সকলের সসম্মানে শান্তিতে বসবাস করার অধিকার রয়েছে
–––––––––––––––––––––––––––––––––
লেখক তালিবানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা তাঁর লেখা প্রবন্ধে তালিবানের বর্তমান আনুষ্ঠানিক অবস্থান উঠে এসেছে নিবন্ধটি নিউ ইয়র্ক টাইমসেWhat We, the Taliban, Wantশিরোনামে প্রকাশিত হয় ছবি নিউ ইয়র্ক টাইমসের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত


Happy

Happy

0 %


Sad

Sad

0 %


Excited

Excited

0 %


Sleepy

Sleepy

0 %


Angry

Angry

0 %


Surprise

Surprise

0 %

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments