Wednesday, September 22, 2021
0 0
Homeশীর্ষ খবরদিল্লিতে মোদির হারে কিচ্ছু এসে যায় না

দিল্লিতে মোদির হারে কিচ্ছু এসে যায় না

Read Time:13 Minute, 43 Second


আসিম আলী, নিউ ইয়র্ক টাইমস:
গত মঙ্গলবার দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বড় ধরনের পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ঘনিষ্ট সহযোগী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হিন্দু জাতীয়তাবাদকে সামনে রেখে বিভেদমূলক সাম্প্রদায়িক প্রচারণা চালিয়েছিলেন, মুসলমানদেরকে দেশের জন্য ভয়ঙ্কর এবং আম আদমি পার্টি (আপ) ও দলটির নেতৃবৃন্দকে দেশদ্রোহী হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন।
তবু দিল্লির ৭০ আসনের মধ্যে মোদি ও অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন বিজেপি জিতেছে মাত্র আটটি আসনে, আর ২০১৫ সাল থেকে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বাধীন আপ জিতেঝে ৬২ আসন।
দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের কর্মী থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া কেজরিওয়াল মূলত তাঁর দলের অবদানের বিষয়কে সামনে রেখে প্রচারণা চালিয়েছিলেন পাবলিক হাসপাতাল পরিষেবায় যে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা ও বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণ এবং দিল্লির বিদ্যুতের মূল্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে তিনি যা করেছেন, সেসবের ভিত্তিতেই প্রচারণা চালিয়েছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কেজরিওয়ালের অবদানের কারণে দিল্লি তাঁকে বেছে নিয়েছে। অথচ বিজেপি পুরো শহর মোদীর ছবি দিয়ে মুড়িয়ে ফেলেছে, কিন্তু কেজরিওয়াল বা তাঁর দলের প্রার্থীদের তুলনায় যোগ্যতর কোন প্রার্থীকে তারা দেখাতে পারেনি।
মোদী এবং তার দল হয়তো একটি নির্বাচনে হেরেছে মাত্র, কিন্তু আদর্শিক যুদ্ধে তাঁরা জিতে গেছে। নির্বাচনী রাজনীতিতে তারা এ কথাটি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে যে, ভারতে নির্বাচনে জিততে হলে এখন আর নাগরিক সমতা এবং ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকারের পক্ষে কিংবা সহিংসতা ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে কথা বলে পার পাওয়া যাবে না।
দিল্লির নির্বাচন এমন এক সময়ে হয়েছে যখন পুরো ভারতজুড়ে গত ডিসেম্বরে মোদী সরকার কর্তৃক পাসকৃত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে, যেটি ধর্মকে নাগরিকত্বের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নতুন আইন মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের সৃষ্টি করে এবং ভারতকে কর্তৃত্ববাদী হিন্দ জাতিতে রূপান্তরিত করার হিন্দু জাতীয়তাবাদী অ্যাজেন্ডা প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে নেয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জোর দিয়ে বলেছেন যে, নতুন নাগরিকত্ব আইনের পর জাতীয় নাগরিকপুঞ্জি বা এনআরসি প্রণয়ন করা হবে, তখন নাগরিকদেরকে নিজেদের ভারতীয়ত্ব প্রমাণে কাগজপত্র জমা দিতে হবে। ভারতের মুসলমানগণ ও উদারতাবাদীদের আশঙ্কা এনআরসি মুসলমানদের নাগরিকত্ব বাতিলের একটি সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
গত দুই মাস ধরে নাগরিকত্ব আইন ও আসন্ন এনআরসির বিরুদ্ধে আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে দরিদ্র মুসলিম বসতি অবধি, দূর সীমান্তের রাজ্য থেকে তারকাখচিত বলিউড অবধি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।
ডিসেম্বরের ১৫ তারিখ মোদী সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন দিল্লির পুলিশ জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়ার শিক্ষার্থীদের উপর সহিংস আক্রমণ চালায়, যে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রচুর মুসলিম শিক্ষার্থী রয়েছে। এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন মুসলিম বসতি শাহীনবাগের শ্রমিক শ্রেণির নারীরা নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বন্ধ করে ফেলেন। রাস্তায় একটি তাঁবু স্থাপন করা হয় এবং আন্দোলনটি দ্রুতই বেপরোয়া হয়ে পড়ে।
দ্রুতই আন্দোলনকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, নাগরিকত্ব আইনবিরোধী সব ধরনের লোকজন শাহীনবাগে এসে সংহতি প্রকাশ করেন। তীব্র শীতের দুটি মাস কেটে গেছে; কিন্তু নারীরা শীত ও হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের আক্রমণ সত্ত্বেও তাদের আন্দোল অব্যহত রাখেন।
দিল্লির নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে মোদী সাহেবের দল শাহীন বাগকে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে এবং আন্দোলনকারীদের মুসলমানিত্বের উপর জোর দিয়ে নগরীর হিন্দুদেরকে ভীত করে তুলতে চেষ্টা করে। ইসলামোফোবিয়ার বয়ান মোদী সাহেবের ভারতে স্বাভাবিক হয়ে গেছে, কিন্তু দিল্লির প্রচারণা সেটিকে আরো তীব্র করে তুলেছে। শাহ সাহেব, যিনি কিনা বিজেপির সভাপতিও বটেন, তিনি সমর্থকদের নিকট যে সুরটি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেটি হলো ইভিএমে বিজেপির প্রতীকের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সেটি শাহীন বাগের আন্দোলনকারীরা (যাদের বেশির ভাগ মুসলিম) আরো উদ্দীপ্ত হবে।
দিল্লির একটি মিছিলে শাহ সাহেবের সহকর্মী ও ভারতের অর্থপ্রতিমন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর এক ভয়াবহ স্লোগান শুরু করেন: “এরা জাতির বিশ্বাসঘাতক, এদের গুলি কর!তার কিছুদিন পর দুই হিন্দু জাতীয়তাবাদী জামিয়া মিল্লিয়ার ছাত্র আন্দোলন ও শাহিনবাগে গুলি করে।
মোদী সাহেবের দলের আরেক সংসদ সদস্য পরবেশ বর্ম শাহীন বাগের আন্দোলনকারীদেরকে খুনি এবং ধর্ষক আখ্যায়িত করে হিন্দুদেরকে ভয় দেখিয়ে বলেন: “তারা আপনাদের ঘরে প্রবেশ করবে, আপনাদের বোন এবং কন্যাদেরকে ধর্ষণ করবে এবং তাদেরকে হত্যা করবে। এখনো সময় আছে। এরপর আর মোদীজি এবং অমিত শাহ আপনাদেরকে রক্ষা করতে আসবেন না।” দলটির অন্য নেতারা শাহিনবাগকে পাকিস্তানের সাথে তুলনা করেন এবং দিল্লি নির্বাচনকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার প্রতিযোগিতা হিসেবে চিত্রায়িত করেন।
কেজরিওয়াল সাহেব নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, এটিকে তিনি অর্থনীতিতে মোদী সাহেবের ব্যর্থতা থেকে জনগণের নজর অন্য দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বয়ান এড়িয়ে গেছেন এবং মুসলমানদের উপর আক্রমণের বিষয়টিও উপেক্ষা করেছেন।
পুলিশ যখন জামিয়া মিল্লিয়াতে ঢুকে ছাত্রদের উপর আক্রমণ করলো, কেজরিওয়াল সাহেব কয়েক দিন ধরে এ বিষয়ে নীরবতা পালন করেন। তাঁকে যখন দিল্লির আন্দোলন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি ঘোষণা করেন দিল্লি পুলিশ যদি কেন্দ্রী সরকারের অধীনে না হয়ে তাঁর সরকারের অধীনে থাকতো, তাহলে তিনি দুই ঘণ্টার মধ্যে শাহিনবাগের রাস্তা পরিস্কার করতেন।
নিজের হিন্দুত্বের উপর গুরুত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি জনসম্মুখে হিন্দু ধর্মীয় প্রার্থনা করেন, এবং নির্বাচনে বিজয়ের ভাষণের পরপর একটি মন্দিরে গমণ করেন। আসলে তিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের নির্ধারণ করে দেওয়া সীমার ভিতরে থেকে কাজ করেছেন এবং তাদের রাজনীতিরই তুলনামূলক শিথিল সংস্করণকে নিজের জন্য গ্রহণ করেছেন।
দিল্লি নির্বাচন থেকে বুঝা যায়, ভারত এমন এক যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে আদর্শিক পরিভাষা ও রাজনীতির ভাষা হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা নির্ধারিত। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে কোন না কোন ভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও উগ্রদেশপ্রেমের যে কোন এক রূপকে ধারণ করতে হবে, যার মূল নজির পেশ করেছেন মোদী সাহেব।
মোদীর ঐকমত্য এ কথা নিশ্চিত করেছে যে ভারতে মুসলমানরা রাজনৈতিকভাবে শুধুই শক্তিহীন নয়, বরং অদৃশ্যও বটে। স্বাধীনতার তেয়াত্তর বছর পর এখনো ভারতের মুসলমানরা সমান নাগরিকত্বের জন্য লড়াই করছে। আমরা এখন চাকরি ও শিক্ষার ক্ষেত্রে সমতা অর্জনের জন্য নয়, বরং শুধু আইনি সমতা অর্জনের জন্য জীবন বাজি রেখে লড়াই করে চলছি।
নয়া নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন মূলত আমাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হওয়া কিংবা নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কারই প্রকাশ। নির্বাচনে বেশির ভাগ নাগরিক যেখানে তাদের বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনা করে ভোট দেয়, ভারতীয় মুসলমানরা সেখানে কেবল নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ভোট দেয়। কেজরিওয়াল সাহেব এবং তাঁর দল আপ মুসলমানদের উদ্বেগের বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া সত্ত্বেও দিল্লির মুসলমানরা গণহারে তাঁর দলকে সমর্থন দিয়েছে, কারণ এই দলটি সক্রিয়ভাবে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ায় না।
মোদী সাহেবের দলে দিল্লিতে পরাজয়কে তার হিন্দু কর্তৃত্ববাদী আদর্শের পরাজয় হিসেবে ব্যাখ্যা করলে সেটি গুরুতর ভুল ব্যাখ্যা হবে। সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুসারে, দিল্লির চার-পঞ্চমাংশ ভোটারই মোদী সাহেবকে সমর্থন করেন এবং তিন-চতুর্থাংশ ভোটার তাঁর কেন্দ্রী সরকারের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
কেজরিওয়াল সাহেব যেভাবে সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গী হিন্দু জাতীয়তাবাদকে এড়িয়ে গিয়ে দিল্লি মতো একটি ছোট শহুরে রাজ্যে শুধুমাত্র সুশাসন ও পরিষেবা সরবরাহ নিশ্চিত করে বিজয়ী হয়েছেন, সেটা দিল্লির বাইরে সম্ভব কিনা তা স্পষ্ট নয়।
প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের (বিজেপি যেটির নির্বাচনী শাখা) একক লক্ষ্য হলো: হিন্দ কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা। এই মূল লক্ষ্যের বিষয়ে মোদী ও তাঁর দলকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মুরোদ আছে, বর্তমানে এমন কোন রাজনীতিবিদও নেই। মোদী সাহেব ও তাঁর দল হয়তো একটা নির্বাচনে হেরেছে, কিন্তু আদর্শিক যুদ্ধে তারাই জিতেছে।
––––––––––––––––––––––
লেখক নয়া দিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চে কর্মরত আছেন। নিবন্ধটি নিউ ইয়র্ক টাইমসে “Modi Lost in Delhi. It Doesnt Matter.” শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। ছবি নিউ ইয়র্ক টাইমসের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।

Happy

Happy

0 %


Sad

Sad

0 %


Excited

Excited

0 %


Sleepy

Sleepy

0 %


Angry

Angry

0 %


Surprise

Surprise

0 %

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments