Tuesday, June 15, 2021
0 0
Homeশীর্ষ খবরট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনা শতাব্দীপ্রাচীন পশ্চিমা অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা

ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনা শতাব্দীপ্রাচীন পশ্চিমা অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা

Read Time:14 Minute, 48 Second


নাথান থ্রাল, নিউ ইয়র্ক টাইমস:
গত মঙ্গলবার ট্রাম্প বহুল প্রত্যাশিত মধ্যপ্রাচ্য শান্তিপরিকল্পনা ঘোষণা করলেন, যেটি তথাকথিত “শতাব্দির সেরা বন্দোবস্ত” বলে আখ্যায়িত হয়ে আসছে। এই পকিল্পনায় বলা হয়েছে পশ্চিম তীর ও গাজাকে নিয়ে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে; পুরনো শহরসমেত অবিভক্ত জেরুজালেম হবে ইসরায়েলের রাজধানী; এবং সকল অবৈধ ইহুদি বসতি ইসরায়েলে অন্তর্ভুক্ত করা হবেএ সকল বসতির মধ্যে রয়েছে জর্দান উপত্যকা, যা কিনা পশ্চিম তীরের এক চতুর্থাংশ, এবং জর্দানের সাথে ফিলিস্তিনের সীমান্ত এই জর্দান উপত্যকায়ই অবস্থিত। এর ফলে ফিলিস্তিন হবে ইসরায়েলি সাগর বেষ্টিত এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো, যার চারপাশে থাকবে শুধুই ইসরায়েল। ট্রাম্প সাহেব ঘোষণা দিয়েছেন যে এই পরিকল্পনায় ইসরায়েলকে যে অঞ্চলসমূহ প্রদান করা হয়েছে, তার প্রতিটির উপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র। তার পরপরই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু সকল বসতি ও জর্দান উপত্যকা অন্তর্ভুক্ত করার কার্যক্রম আগামী রোববার থেকে শুরু করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
ইসরায়েলের ডানপন্থী রাজনীতিক ও দুই-রাষ্ট্র সমাধানের অন্যান্য বিরোধীরা এই প্রস্তাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন, কারণ স্পষ্টতই এর মাধ্যমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সকল সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে গেছে। ইসরায়েলি বামপন্থীরা, পিএলও এবং দুই-রাষ্ট্র সমাধানের অন্যান্য সমর্থকরা এই প্রস্তাবনার সমালোচনা করছেন এই একই কারণে, তারা বলছেন এর মাধ্যমে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের কফিনে সর্বশেষ পেরেকেটি মারা হয়েছে।
অর্থাৎ এই প্রস্তাবনার সমর্থক এবং সমালোচক, উভয়েই এ বিষয়ে একমত যে এর মধ্য দিয়ে কয়েক দশকের মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নীতি ভঙ্গ করা হয়েছে। কিন্তু আসলেই কি পরিকল্পনাটি এই দ্বন্দ্ব সম্পর্কে দীর্ঘদিন থেকে বজায় থাকা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থানের বিপরীত? নাকি বাস্তবে এটি তাদের অবস্থানের যৌক্তিক পরিপূর্ণরূপ?
শতাব্দি কাল ধরে ফিলিস্তিনের আদি বাসিন্দাদের বলি দেওয়ার ইসরায়েলি লক্ষ্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে পাশ্চাত্য। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার ইহুদি জনগণের জন্য ফিলিস্তিনে একটি জাতীয় মাতৃভূমি (!) প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে, যেখানে সে সময় ইহুদি ছিল মোট জনগণের ৮ শতাংশেরও কম। তিরিশ বছর পর জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে ভাগ করার জন্য একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করে, যে পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ ভূমি ইহুদিদেরকে দেওয়া হয়, যেখানে তারা তখনো মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও কম ছিল, আর তাদের মালিকানায় ছিল ৭ শতাংশের কম ভূমি। পরবর্তী যুদ্ধের সময় ইসরায়েল আরব রাষ্ট্রের জন্য বরাদ্দকৃত ভূমির অর্ধেকেরও বেশি দখল করে; ইসরায়েলের এই নতুন সীমান্তের ভিতর বসবাসকারী চার-পঞ্চমাংশ ফিলিস্তিনিকে তখন তাদের বাড়ি ফিরতে বাধা দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তখন ইসরায়েলকে জবরদখলকৃত ভূমি ফেরত দেওয়ার জন্য কিংবা শরণার্থীদেরকে তাদের বাড়ি ফেরার সুযোগ দেওয়ার জন্য চাপ দেয়নি।
১৯৬৭ সালের পর ইসরায়েল যখন ফিলিস্তিনের অবশিষ্ট ২২ শতাংশ দখল করে ফেলে, সেই সাথে মিসরের সিনাই উপদ্বীপ এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে নেয়, ইসরায়েল তখন দখলকৃত অঞ্চলে অবৈধভাবে বসতি গড়ে তুলে। এবং একই ভূমিতে বসবাসরত দুই গোষ্ঠী তথা ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের জন্য ভিন্ন আইনের শাসন চালু করে। ১৯৮০ সালে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্বজেরুজালেম দখল করে, তখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নামেমাত্র কিছু আন্তর্জাতিক নিন্দাজ্ঞাপন হলেও মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা ইসরায়েলকে শক্তিশালী করে।
১৯৯৩ সালে ওসলো চুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের জন্য তাদের বিচ্ছিন্ন দ্বীপতূল্য অঞ্চলসমূহে সীমিত স্বায়ত্তশাসনের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু এই চুক্তিও ইসরায়েলি বসতি উচ্ছেদ; কিংবা নিদেনপক্ষে আর নতুন কোন বসতি স্থাপন না করার দাবি জানানো হয়নি। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম মার্কিন পরিকল্পনা উপস্থাপিত হয় বিল ক্লিন্টনের আমলে ২০০০ সালে। এতে বলা হয় বড় বড় ইহুদি বসতি সমূহ ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত হবে, এবং একই ভাবে পূর্ব জেরুজালেমের সকল ইহুদি বসতিও ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত হবে। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র হবে বেসামরিকিকৃত, এবং সেখানে ইসরায়েলি সামরিক অবস্থান থাকবে, আর জর্দান উপত্যকায় থাকবে আন্তর্জাতিক বাহিনী, যা প্রত্যাহার করা হতে পারে শুধুমাত্র ইসরায়েলের সম্মতির ভিত্তিতে। “শতাব্দির বন্দোবস্তের” মতই, সেই পরিকল্পনায়ও ফিলিস্তিনকে সামান্য বেশি স্বায়ত্তশাসণ দেওয় হয়েছিল, এবং সেটিকেই রাষ্ট্র বলা হয়েছিল।
এখনো, ইসরায়েলের সামরিক হিসাব অনুসারে ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে ইসরায়েলিদের তুলনায় বেশি সংখ্যক ফিলিস্তিনি বসবাস করছে। ট্রাম্প সাহেবের পরিকল্পনায়ই হোক, কিংবা ক্লিন্টন সাহেবে পরিকল্পনায়ই হোক, সংখ্যাগরিষ্ঠ নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে দেওয়া হয়েছে এক-চতুর্থাংশেরও কম ভূমি, আর তার সাথে ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্বের উপর বিধি-নিষেধ তো আছেই। কাজেই এসব প্রস্তাবনা থেকে যে ফলাফল আসবে, সেটাকে বড় জোর দেড়-রাষ্ট্র সমাধান বলা যেতে পারে, দুই-রাষ্ট্র সমাধান নয়।
ট্রাম্প সাহেবের পরিকল্পনায় অনেকগুলো ভুল রয়েছে: এটিতে ফিলিস্তিনিদের তুলনায় ইহুদিবাদী স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনা অবৈধ বসতি স্থাপন এবং ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ প্রক্রিয়াকে পুরষ্কৃত এবং উৎসাহিত করেছে। কিন্তু এর কোনটাই অতীতের রীতি কিংবা নীতি ভেঙে করা হয়নি। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় কেবলমাত্র একটি বাড়ির নির্মাণকাজের শেষ অংশটুকু করা হয়েছে, রিপাব্লিকান ও ডেমক্র্যাট উভয় দলের আইনপ্রণেতারা মিলে যে বাড়ি নির্মাণে কয়েক দশক ধরে সহযোগিতা করে আসছেন। গত কয়েক দশক ধরে ইসরায়েল যখন ধীরে ধীরে পশ্চিম তীর দখল করছে, দখলকৃত ভূমিতে ৬ লাখেরও বেশি দখলদারকে পাঠিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তখন ইসরায়েলকে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে ভেটো দিয়েছে, আন্তর্জাতিক আদালত ও তদন্তকারী সংস্থাসমূহের উপর চাপ প্রয়োগ করেছে যাতে করে ইসরায়েলকে কোন ধরনের চাপ না দেওয়া হয়, এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা প্রদান করেছে।  
কোন কোন ডেমক্র্যাট রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী এখন বলছেনন যে তারা ইসরায়েলি এই দখলদারি অনুমোদন করেন না, কিন্তু তারাও এটা বন্ধ করার কোন উপায় প্রস্তাব করছেন না। যেমন মূলধারার ডেমক্র্যাট সিনেপর অ্যামি ক্লবুচার এই দখলদারির বিরুদ্ধে তার অবস্থান ঘোষণা করেছেনে, এবং ট্রাম্পের সমালোচনা করে লেখা একটি চিঠিতে সাক্ষরও করেছেন। কিন্তু ২০১৬  সালে যখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল ইসরায়েলের অবৈধ বসতি স্থাপন বন্ধের আহ্বান জানিয়ে রেজুলেশন পাশ করেছিল, তখন নিরাপত্তা কাউন্সিলের সেউ রেজুলেশনের বিরুদ্ধে গুরুতর আপত্তি প্রকাশ করা” সিনেট রেজুলেশনের কো-স্পন্সর ছিলেন এই তিনিই।
সিনেটর বের্নি স্যান্ডার্স ব্যতীত অন্য কোন রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কোন প্রস্তাবনার কথা বলেননি যা ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের অধিকার লঙ্ঘনে মার্কিন জটিলতা হ্রাস করবে। দখলদারির বিরোধিতা করার ঘোষণা দেওয়াটা আসলে অন্তঃসারশূন্য, যদি না সেই ঘোষণায় দখলদারি বন্ধের উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত প্রস্তাবনাসমূহ অন্তর্ভুক্ত থাকে: অবৈধ বসতি নির্মাণের পণ্যসমূহ নিষিদ্ধ করা; দখলিকৃত অঞ্চলে ইসরায়েল যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে বসতি স্থাপন করছে, সেই পরিমাণ আর্থিক সহায়তা হ্রাস করা; অবৈধ বসতি স্থাপনের সাথে জড়িত কোম্পানিগুলো থেকে ফেডারেল এবং স্টেট সরকারের পেনশন তহবিল সরিয়ে নেওয়া; ইসরায়েল যতক্ষণ না গাজায় অবরুদ্ধ বিশ লক্ষ মানুষকে শাস্তি দেওয়া বন্ধ করে, ততক্ষণ পর্যন্ত সামরিক সহযোগিতা স্থগিত করা এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদেরকে সমান নাগরিক অধিকার প্রদান, যতটুকু নাগরিক অধিকার তাদের আশেপাশে বসবাসরত ইহুদিরা পাচ্ছে।
ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা কয়েক দশক ধরে চলে আসা শান্তি প্রক্রিয়ার মতোই ইসরায়েলকে কথিত স্থিতাবস্থার আচ্ছাদন দিচ্ছে, যার মাধ্যমে ইসরায়েল জর্দান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকার পায়, কোটি কোটি মানুষকে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তাদের চলাফেরায় বিধি নিষেধ আরোপ করে, তাদের যে কোন বক্তব্যকে “জনশৃঙ্খলা” বিঘ্ন করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে, কোন ধরনের বিচার কিংবা অভিযোগ ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য “প্রশাসনিক আটকের” নামে বন্দী করতে পারে। আর এসব চলাকালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং অন্যরা এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েরে পিঠ চাপড়ে দিতে থাকে, সেই সাথে আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার খাতিরে “অর্থপূর্ণ সংলাপ” পুনরায় শুরু করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে থাকে।
ইসরায়েলের সমর্থকরা বলতে চাইবেন যে ইসরায়েলকে এক ঘরে করে ফেলা হয়েছে, এবং তারাই সঠিক। অথচ ইসরায়েল হলো একমাত্র রাষ্ট্র, যেটি স্থায়ীভাবে সামরিক দখলদারিত্ব চালিয়ে যাচ্ছে, একই অঞ্চলে বসবাসরত দুটি গোষ্ঠীর জন্য বৈষম্যমূলক পৃথক আইন প্রয়োগ করছে, অথচ তাদের পক্ষে সাফাই গাইতে, তাদের রক্ষা করতে, এমনকি তাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে দুনিয়ার আত্মস্বীকৃত উদারবাদীরা পারলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। ট্রাম্পের পরিকল্পনার সমালোচনা কারী ডেমক্র্যাটরা আসলে তার চেয়ে ভালো কেউ নন, কারণ তারা কেউই ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে যথাযথ কোন অবস্থান গ্রহণ করছেন না। কথায় না হলেও কাজে তারাও দখলদারি যুলুমবাজির সমর্থক, ট্রাম্পেরই মতো।

লেখক ইন্টার্ন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আরব-ইসরায়েল প্রকল্পের পরিচালক। নিবন্ধটি নিউ ইয়র্ক টাইমসে Trumps Middle East Peace Plan Exposes the Ugly Truth” শিরোনামে প্রকাশিত। ছবি নিউ ইয়রক্ টাইমসের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।

Happy

Happy

0 %


Sad

Sad

0 %


Excited

Excited

0 %


Sleepy

Sleepy

0 %


Angry

Angry

0 %


Surprise

Surprise

0 %

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments