Wednesday, June 16, 2021
0 0
Homeমধ্যপ্রাচ্যতুরস্ক কেন সিরিয়ায় যুদ্ধে জড়ালো?

তুরস্ক কেন সিরিয়ায় যুদ্ধে জড়ালো?

Read Time:14 Minute, 27 Second


মেভলুত চাভুসোগ্লু, নিউ ইয়র্ক টাইমস:
দুঃখজনক হলেও সত্যি, সিরিয়ার উত্তরপূর্বাঞ্চলে তুরস্কের অভিযানের বিষয়টিতে মার্কিন গণমাধ্যমে কুর্দিদের উপর হামলা হিসেবে দেখানো হচ্ছে, দেখানো হচ্ছে দায়েশের (কথিত ইসলামিক স্টেট) অবশিষ্টাংশের বিরুদ্ধে লড়াইকে দুর্বল করে ফেলার প্রচেষ্টা এবং মিত্রদের নিকট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার উপর আঘাত হিসেবে আমি বিষয়টি স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে অনুভব করছি, কারণ তুরস্কযুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ৬৭ বছরের পুরনো ন্যাটো জোট কোন সাময়িক, কৌশলগত কিংবা নিছক লেনদেনভিত্তিক কোন ঐক্য নয়
সীমান্তবর্তী এলাকায় সন্ত্রাসীদের দ্বারা সৃষ্ট ঝুঁকি দূরীকরণের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তুরস্ক চলমান অভিযান শুরু করেছে এই অভিযান এসব এলাকায় বসবাসরত সিরীয়দেরকে সন্ত্রাসী সংগঠনসমূহের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্তি দেবে এবং সিরিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতা রাজনৈতিক ঐক্যকে হুমকির মুখ থেকে বাঁচাবে। এই দুই ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটলে বাস্তুচ্যুত সিরীয় নাগরিকগণ নিরাপদে এবং স্বেচ্ছায় তাদের দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে
তুরস্ক কখনোই তার সীমান্তে কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর করিডর মেনে নেয়নি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদসহ বিভিন্ন জায়গায় আমরা বারবার সীমান্তে একটি নিরাপদ অঞ্চল (সেফ জোন) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছি জাতিসংঘে আমরা সন্ত্রাসীদেরকে তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলাম
কিন্তু মার্কিন নিরাপত্তা বিষয়ক আমলাতন্ত্র পিওয়াইডি/ওয়াইপিজি নামে পরিচিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী থেকে আলাদা হতে পারেনি যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে, সিরিয়ার ডেমক্র্যাটিক ফোর্সের প্রধান অংশটি গঠিত যে ওয়াইপিজি দ্বারা, সেই ওয়াইপিজি মূলত তুরস্কের কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) অবিচ্ছেদ্য অংশ আর পিকেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ ন্যাটো কর্তৃক স্বীকৃত সন্ত্রাসী সংগঠন
আমাদের সাথে সংলাপরত মার্কিন প্রতিনিধিও এসকল শক্তিকে সীমান্ত থেকে অপসারণ করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে একমত হয়েছিলেন বলে মনে হয়েছিল, এমনকি বিষয়ে একটি সময়সীমার বিষয়েও আমরা একমত হয়েছিলাম অতি সম্প্রতি উভয় পক্ষের সামরিক বাহিনীর মধ্যকার আলোচনায় গত আগস্টে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, এমন একটি নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হবে, যেখান থেকে পিওয়াইডি/ওয়াইপিজিকে অপসারণ করা হবে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন তো করলোই না, বরং উল্টো তাদের কার্যক্রমে আমাদের স্পষ্ট ধারণা তৈরি হলো যে তারা কালক্ষেপণ করছে, যাতে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সিরিয়ার আরো গভীরে প্রবেশ করতে পারে
পিওয়াইডি/ওয়াইপিজি হয়তো সারা দুনিয়ার সামনে নিজেদেরকে দায়েশবিরোধী গুরুত্বপূর্ণ যোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে, কিন্তু এই সংগঠনটিই তুরস্কের মাটিতে সুড়ঙ্গ খনন করে পিকেকের নিকট বিস্ফোরক সরবরাহ করে থাকে এই সংগঠনের সদস্যরা দায়েশের কারাবন্দীদেরকে তুরস্কে পাঠাচ্ছে, এমনটাও আমরা পেয়েছি এবং ২০১৭ সালের নভেম্বরে বিবিসি একটি গোপন চুক্তির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যে চুক্তির অধীনে সিরিয়ান ডেমক্র্যাটিক ফোর্সেস রাকা শহর মুক্ত করার স্বার্থে যৌথ অভিযান চলাকালে শত শত দায়েশ সন্ত্রাসীকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয় এবং যানবাহনের ব্যবস্থা করে দেয়
আমাদের কিছু একটা করতে হচ্ছিল অনেকেই সিরিয়ায় কুর্দি জনসাধারণের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আমরা আবারো বলতে চাই, এবং কথার উপর গুরুত্ব দিতে চাই যে, তুরস্কের লড়াই কুর্দিদের বিরুদ্ধে নয় আমাদের যুদ্ধ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনায় কুর্দিদের বিরুদ্ধে তুরস্কজাতীয় যে কোন বর্ণনা মূলত বিদ্বেষপ্রসূত এবং মিথ্যা কুর্দিরা আমাদের শত্রু নয়
আমাদের লক্ষ্যবস্তু হলো কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি পিওয়াইডি/ওয়াইপিজি কর্তৃত পরিচালিত যৌথ সন্ত্রাসী কার্যক্রম, যারা কিনা শিশু সৈনিকদের নিযুক্ত করছে, ভিন্নমতাবলম্বীদেকে ভীতি প্রদর্শন করছে, ডেমোগ্রাফি পরিবর্তন করে ফেলছে এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে ভর্তি করছে
কুর্দি, আরব, খ্রিষ্টান এবং অন্য যারাই পিওয়াইডি/ওয়াইপিজির অধীনে ভুক্তভোগী আছে, তারা সকলেই সন্ত্রাসীদের থেকে মুক্তি পেলে উপকৃত হবে ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল অব আরামিয়ান খ্রিষ্টান বিষয়টির উপর বিশেষভাবে জোর দিয়ে আসছে
এই অভিযান পরিচালনা শুরুর আগে আমরা নিরস্ত্র জনগণের ঝুঁকি হ্রাস এবং মানবিক সংকট প্রতিহত করার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি গত কয়েক বছর ধরে তুরস্ক আরব, কুর্দ তুর্কমানসহ সকল জাতির বিরাট সংখ্যক শরণার্থীদেরকে আশ্রয় প্রদান করছে
৩০০,০০০ এরও বেশি কুর্দিসহ এসকল শরণার্থীর বেশির ভাগই সন্ত্রাসীদের দ্বারা বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন আমরা তুরস্কে তাদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছি, আশ্রয় দিয়েছি, জীবনধারণের ব্যবস্থা করে দিয়েছি আমরা তাদের সাথে আমাদের রুটি ভাগাভাগি করেছি, গণ পরিষেবা ভাগাভাগি করেছি তুরস্ক মানবিক খাতে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ব্যয়কারী দেশ, এবং সবচেয়ে বেশি শরণার্থীদের আশ্রয়দাতা দেশ
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ক্ষেত্রে তুরস্ক গত তিন বছরে বিশ্বাসযোগ্য নজির স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে ২০১৬১৭ সালে জারাবুলুস এবং তার আশেপাশে তুরস্কের অভিযান, ২০১৮ সালে আফরিন অভিযানসহ সিরিয়ার উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে তুরস্কে পূর্ববর্তী অভিযানসমূহ বিশাল এলাকাকে সন্ত্রাসীমুক্ত করেছে এসকল অভিযানের ফলে সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার ভুক্তভোগী জনসাধারণ শান্তিতে বসবাস করতে শুরু করেছে, নিয়মতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সুফল পেতে শুরু করেছে প্রায় ৩৬৫,০০০ শরণার্থী সিরিয়ার উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে তাদের বাড়িঘরে ফিরে গিয়েছে
এসব অঞ্চলে আমরা গণপরিষেবা চালু করেছি, ২৩০,০০০ এরও বেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয় স্থাপন করেছি সিরিয়ার উত্তরপশ্চিমাঞ্চলের মুক্ত এলাকাসমূহে ৫৫টি অ্যাম্বুলেন্স, সিরীয় তুর্কিসহ দুই সহস্রাধিক কর্মী নিয়ে টি হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে একটি স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন খেলাধুলা বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এসব অঞ্চলে ব্যবসায়বাণিজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বাণিজ্যের সুবিধার্থে একটি সীমান্তপথ খোলে দেওয়া হয়েছে কৃষি পশুপালনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও প্রদান করা হয়েছে
আপনি যদি তুরস্কের পূর্ববর্তী অভিযানসমূহের সাথে জোট কর্তৃক রাক্কা শহর ধ্বংস করে দেওয়ার অভিযানের তুলনা করেন, তাহলে দেখতে পাবেন আমরা কতটুকু সতর্কতার সাথে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানসমূহ পরিচালনা করি সকল অভিযান থেকে আমরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, সেসকল অভিজ্ঞতা আমাদেরকে এখন আরো ভালোভাবে অভিযান পরিচালনা করতে সহযোগিতা করবে
পিকেকে এবং পিওয়াইডি/ওয়াইপিজি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ব্ল্যাকিমেইল করে দাবি করছে যে, তাদেকে বাদ দিলে দায়েশের বিরুদ্ধে লড়াই দূর্বল হয়ে পড়তে পারে কিন্তু আদতে এসকল নৃশংস সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই মোটেও দূর্বল হবে না, বিশেষত আমাদের মিত্ররা যদি তাদের অবস্থানে ঠিক থাকেন এবং তুরস্কের সাথে সহযোগিতা অব্যহত রাখেন আমরাই একমাত্র জাতি, যারা দায়েশের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে আছি
দায়েশ এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনসমূহের বিরুদ্ধে লড়াই সকলের অংশগ্রহণ সহযোগিতার মাধ্যমে অব্যহত রাখতে হবে অনেক ইউরোপীয় দেশ এসকল গোষ্ঠীর সাথে সংযুক্ত তাদের নাগরিকদেরকে দেশে ফেরার অনুমতি দিতে অনিচ্ছুক যদিও সমস্যা থেকে দূরে থাকতে চাওয়া কখনোই কোন নীতি হতে পারে না তাদেরকে অবশ্যই নিজেদের বোঝা নিজেদের কাঁধেই নিতে হবে
তুরস্কে আমরা বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত যে, আমরা সিরীয় শরণার্থীদের বাড়ি ফেরার পথ প্রশস্ত করছি, দায়েশ এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পুনরায় উত্থান ঘটবে না এমন নিশ্চয়তাও আমরা দিতে পারি
আমি বিষয়ে সচেতন আছি যে, সিরীয় শরণার্থীদের নিরাপদ এবং স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তন অবশ্যই খুবই সতর্কতার সাথে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপিত হতে হবে এই প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থার সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হতে হবে সিরিয়া বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর আবাসস্থল, কাজেই চলমান সিরীয় সংকটের রাজনৈতিক সমাধান হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কার্যকরী প্রতিনিধিত্বমূলক স্থানীয় কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা দরকার
আমাদের সর্বশেষ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের পর, কুর্দি সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাসমূহে তুরস্ক স্থানীয় সরকার কাউন্সিল সমূহে কুর্দিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে, যাতে স্থানীয় সরকারে স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়
সিরীয় শরণার্থীরা এখন তাদের দেশে ফিরতে চায় তারা প্রচুর কষ্ট ভোগ করেছে স্বদেশপ্রত্যাবর্তনকারী মিলিয়ন মিলিয়ন শরণার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় শান্তিপূর্ণ অবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছি প্রচলিত ধারণার বিপরীতে আমাদের অভিযান সমস্যার মানবিক দিক চিহ্নিত করতে সহযোগিতা করবে, ঐক্য পুনরুদ্ধার করতে অবদান রাখবে এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত করবে
––––––––––––––––––––––––––––––
লেখক তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মূল নিবন্ধটি নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে Why Turkey Took the Fight to Syria শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে ভাষান্তর কর্তৃক নিবন্ধটি অনূদিত, এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে ছবি সংগৃহীত

Happy

Happy

0 %


Sad

Sad

0 %


Excited

Excited

0 %


Sleepy

Sleepy

0 %


Angry

Angry

0 %


Surprise

Surprise

0 %

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments