Tuesday, June 15, 2021
0 0
Homeশীর্ষ খবরভারতীয় আগ্রাসনই কাশ্মীরি প্রতিরোধ আন্দোলনকে উত্তপ্ত করছে..

ভারতীয় আগ্রাসনই কাশ্মীরি প্রতিরোধ আন্দোলনকে উত্তপ্ত করছে..

Read Time:14 Minute, 6 Second

ভারতীয় বাহিনীর টিয়ার গ্যাস থেকে আত্মরক্ষার জন্য দৌড়াচ্ছে কাশ্মীরিরা
ভারতীয় বাহিনীর টিয়ার গ্যাস থেকে আত্মরক্ষার জন্য দৌড়াচ্ছে কাশ্মীরিরা

রুওয়া শাহ, আল জাজিরা ইংরেজি:
২০১০ সালের ১১ জুন আমি আমার জীবনে প্রথমবারের মতো মাতৃভূমি কাশ্মীরের দুঃখজন ও সহিংস বাস্তবতার মুখোমুখি হই। যখন গুলির আওয়াজ শুনি, তখন আমি রাজধানী শ্রীনগরের ডাউনটাউন এলাকায় আমার টিউশন সেন্টার থেকে বেরুচ্ছিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে রাস্তায় আতঙ্ক ছেয়ে যায়, শত শত ছাত্র একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এদিক-ওদিক দৌড়াতে শুরু করে।
আমিও আত্মগোপনের জন্য একটুখানি জায়গা খোঁজছিলাম, তখন এক তরুণের শরীর দেখতে পেলাম নিশ্চল পড়ে আছে। তার পুরো শরীর ছিল রক্তমাখা, চোখ ছিল গুলিবিদ্ধ। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে সে মৃত।
পরে জানলাম, এই দেহটি ছিল শ্রীনগরের একটি প্রাইভেট স্কুলের ১০ম শ্রেণির ছাত্র তোফায়েল মাট্টুর। ভারতীয় সৈনিক কর্তৃক খুব কাছে থেকে ছোড়া টিয়ার গ্যাসে সে নিহত হয়েছিল।
সমস্যার শুরু হয়েছিল মে মাসে, যখন ভারতীয় সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণরেখার কাছাকাছি জায়গায় তিন নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে পাকিস্তান থেকে অনুপ্রবেশকারী “সন্ত্রাসী” দাবি করে হত্যা করে। কাশ্মীরিরা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করার জন্য রাস্তায় নেমে আসেন, পুলিশ তার চেয়েও বেআইনি সহিংসতার মাধ্যমে এই আন্দোলন মোকাবেলা করে। কয়েক মাসের মধ্যে তারা ১০০ জন হত্যা করে, যাদের অনেকেই ছিলেন অল্পবয়স্ক শিক্ষার্থী।
মিলিয়ন মিলিয়ন কাশ্মীরির মতো আমিও ২০১০ সালের গ্রীষ্মকাল পরিবারের সাথে ঘরের ভিতরেই কাটিয়েছিলাম। তখন কারফিউ চলছিল, কেউ কারফিউ ভেঙে প্রতিবাদ করার দুঃসাহস দেখালে রাস্তায় পড়ে আহত কিংবা নিহত হওয়ার ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হতো।
গ্রীষ্মকাল শেষে কারফিউ প্রত্যাহার করা হলেঅ এবং ভারতীয় সরকার ও চ্যানেলসমূহ আমাদেরকে বললো যে, উপত্যকায় “শান্তি” ফিরে এসেছে। আমাদের জীবসন আবার “স্বাভাবিক” হলো।
কিন্তু আমি স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাইনি। কিছু একটা একেবারেই বদলে গিয়েছিল। তোফয়েল হত্যাকাণ্ড ছিল আমার জন্য কাশ্মীর সংঘাতের সহিংসতার প্রথম সরাসরি অভিজ্ঞতা। এই প্রথমবার আমি উপলব্ধি করলাম, কাশ্মীরে বসবাসরত একজন তরুণ হিসেবে ঠিক কী ধরনের ঝুঁকিতে আমি আছি।
আসলে আমি যখন শিশু ছিলাম, তখন থেকেই ভারতীয় রাষ্ট্রের আচরণ ও নিরাপত্তার অজুহাতে কাশ্মীরে তাদের উপস্থিতি নিয়ে আমি প্রশ্ন করতে শুরু করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি নিজেকে করা একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজে পেলাম: কেনা আমরা আজাদি চাই?
এবং আমিই একমাত্র ব্যক্তি নই, যে ২০১০ সালে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলাম। পুরো একটি প্রজন্ম ভারতের নৃশংসতার সাক্ষী হয়েছিলো, যা প্রত্যাখ্যান ও প্রতিরোধের বীজ বপন করছিল।
ঐ বছর কোন এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় এক দল ভারতীয় কর্মকর্তা কোন কারণ ছাড়াই, নিছক বিনোদনের উদ্দেশ্যে তিন কাশ্মীরি কিশোরকে মারধর ও লাঞ্ছিত করেছিল। ঐ ঘটনার পর এদের মধ্য থেকেই একটি ছেলে প্রতিশোধ গ্রহণের শপথ করেছিল। কয়েক সপ্তাহ পর, ১৫ বছর বয়সী ছেলেটি তার গৃহত্যাগ করে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী দলে যোগ দেয়। তার নাম ছিল বুরহান ওয়ানি।
প্রায় ছয় বছর পর ২০০৬ সালে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী তাকে হত্যা করে।
তখন থেকে তিনি একজন জনপ্রিয় বিদ্রোহী কমান্ডার এবং কাশ্মীরি সশস্ত্র সংগ্রামের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একটিতে পরিণত হন। ওয়ানির মৃত্যুর ফলে পুরো উপত্যকায় পাঁচ মাস ধরে আন্দোলন বিস্তার লাভ করেছিল, সে সময় এক শতাধিক আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।
এ আন্দোলনের ফলাফল সম্পর্কে আমি আমার দাদা সৈয়দ আলি শাহ গিলানির সাথে কথা বলছিলাম, যিনি অল পার্টিজ হুররিয়াক কনফারেন্স (এপিএইচসি) নেতা এবং ২০১০ সাল থেকে তিনি গৃহবন্দী অবস্থায় আছেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “বুরহান এবং অন্য যে সকল তরুণ ভারতের বিরুদ্ধে বন্দুক হাতে তোলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির জন্য ভারতই দায়ী।”
২০১০ সালে কাশ্মীরে সশস্ত্র দলগুলোতে যোগদানকারী একমাত্র তরুণ যে বুরহান, তা কিন্তু নয়। আরো অনেকেই একই কাজ করেছিল, যাদের বেশির ভাগই দক্ষিণ কাশ্মীরের। ভারতের নৃশংসতা ও নির্যাতনই তাদেরকে এরকম করতে উৎসাহিত করেছে। এবং বুরহান নিজে যখন নিহত হয়েছিলেন, তখন সেটাও কিন্তু কাশ্মীরের নতুন একটি প্রজন্মকে নিপীড়নের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিতে উৎসাহিত করেছিল।
এদিকে ভারতীয় সকার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ আন্দোলনের নেতাদেরকে দমন করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমার বাবা আলতাফ আহমাদ শাহ ২০১৭ সালে আরো অনেক কাশ্মীরি নেতার সাথে গ্রেফতার হয়েছিলেন। তিন স্বাধীনতাবন্থী এপিএইচসি নেতা। তারা প্রকাশ্যে সশস্ত্র আন্দোলন বর্জন করা সত্ত্বেও এরকমটি হয়েছিল।
এটা আসলে আমাদের করণীয়ন নয়। এটা বরং আত্মহত্যা করার সমতূল্য, শৈশবে সশস্ত্র প্রতিরোধের মতো জটিল বিষয়ে আমার যখন বাবার সাথে কথা হচ্ছিল, তখন তিনি এরকমটাই বলছিলেন। আমি যখন তাকে এর বিকল্প উপায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি বলেছিলেন, “আমাদেরকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সকল সম্ভাব্য উপায়ে আমাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে হবে।”
আমার বাবার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং “ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তৈরির ষড়যন্ত্র”র অভিযোগ আনা হয়েছে, তাকে নয়া দিল্লীর তিহার জেলে নিয়ে যাওয়া হয়, আজ অবধি তিনি সেখানেই আছেন।
কাশ্মীরের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখেন, এমন যে কারো নিকট এটি স্পষ্ট যে এসকল গ্রেফতার মূলত কাশ্মীরের স্বাধীনতা সংগ্রামের কণ্ঠস্বরগুলো ভেঙে ফেলার জন্য ভারতীয় সরকারের পদক্ষেপ মাত্র।
আজ, আমি মনে করি, এসকল গ্রেফতার আসলে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের জন্য ভারতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এভাবেই যে কোন শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম শুরু হওয়ার আগেই দমন করে।
আগস্টে ভারতীয় রাষ্ট্র আবারো কাশ্মীরের জনগণের ‍উপর তাদের বর্বরতার মাত্রা ছাড়িয়েছে। আমি এখন বিদেশে থাকি, এখান থেকে আমাকে দেখতে হচ্ছে কীভাবে আমার আত্মীয়-স্বজন পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিচ্ছেন। নির্মম নির্যাতন এখনো অব্যহত আছে, তাই এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কাশ্মীর পুরোপুরি গণমাধ্যম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে।  
৪০ দিন আগে আমি আমার মায়ের সাথে কথা বলেছিলাম। আমার এক প্রতিবেশী কাশ্মীর থেকে পালিয়ে নয়া দিল্লীতে গিয়েছেন, তাঁর কাছ থেকে খবর পেয়েছি যে “বাড়ির সবাই ভালো আছেন।” তিনি আমার নিকট আমার মায়ের রেকর্ডকৃত ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছেন, যেটিতে মা আমাকে শক্ত থাকতে বলেছেন।
এই সকল সহিংসতা এবং কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকার করার ফলস্বরূপ একটি অপ্রত্যাশিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। এসবের ফলে বিচ্ছিন্নতাবাদই কাশ্মীরের মূলধারায় পরিণত হবে।
বছরের পর বছর ধরে ভারত ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি) এবং পিপলস ডেমক্র্যাটিক পার্টির মতো স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর নিকট থেকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পাচ্ছিল। কিন্তু বর্তমানে, এমনকি যারা ভারতীয় সংবিধানের আলোকে শপথ নিয়েছিলেন, তারাও হয়তো কারাগারে, নয়তো গৃহবন্দী অবস্থায় আছেন। বিষয়টা এমন নয় যে, এসকল দল ঠিকটাক মতো কাশ্মীরি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে, কিংবা তাদের অনুভূদি ধারণ করছে, কিন্তু অন্ততপক্ষে ভারতের কিছু মানুষ ছিল যারা তাদের পক্ষে কথা চালিয়ে যেতে পারে।
এখন, সকল কাশ্মীরি নেতাকে কারারুদ্ধ করেছে, এমনকি তাদের মধ্যে এমন অনেকেও আছেন যারা ভারতের সাথে কাজ করতে চান। এসবের পর নয়া দিল্লী সরকার কাশ্মীরের জনগণের সাথে যে কোন গঠনমূলক সংলাপের সুযোগই শেষ করে ফেলেছে।
আমার অনেক তরুণ কাশ্মীরি বন্ধু আছে, যারা এক সময় অন্তর থেকে নিজেদেরকে ভারতীয় মনে করতেন। এখন তারা তাদের মন পরিবরত্ন করছেন বলে মনে হচ্ছে।
আমার এক বান্ধবী এক সময় এনসি প্রধান ফারুক আব্দুল্লার সাথে তার একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছিল, সেখানে তাকে কাশ্মীরের শ্রেষ্ঠ নেতা” আখ্যায়িত করেছিল, এখন সে বলে যে ৫ আগস্ট যা ঘটেছে, তার জন্য সে সকল মূলধারার কাশ্মীরি নেতাকে দায়ী মনে করে। সে আমাকে বলছে, “তারা সকলেই বিক্রি হয়ে গেছেন এবং আমাদের আর করার কিছুই নেই।
বছরের পর বছর ধরে ভারত সরকার এটা নিশ্চিত করছে যে, কাশ্মীরের প্রতিটি নতুন প্রজন্ম যেন দখলদারদের নৃশংসতার সাক্ষী হয়, এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এর মাধ্যমে কাশ্মীরে প্রতিরোধের নতুন ঢেউ তৈরি করছে। এই প্রজন্ম হয়তো ভারতের সাথে স্বাধীনতার চেয়ে কম কোন কিছুর বিনিময়ে সমোঝতা করতে কখনোই রাজি হবে না।
২০১০ সালের ঘটনার পর থেকে প্রতি বছরই আমরা এ ধরনের শিরোনাম পড়ে থাকি: “কাশ্মীর আরেকটি সহিংস বছর কাটালো” কিংবা “আবারো উত্তপ্ত কাশ্মীর” অথবা “অশান্ত হতে পারে কাশ্মীর।”
এবছরও এরকম বিদ্রোহই প্রত্যাশিত। যাই হোক, এর বিপরীতে ভারতীয় সরকার বহু সেনা প্রেরণ করলেও এসব কখনোই কাশ্মীরিদের প্রতিরোধ দমন করতে পারবে না। সরকার ৫ আগস্ট যা করেছে, তা কোন কাশ্মীরিই গ্রহণ মেনে নেবে না।
এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং আল জাজিরার সম্পাদকীয় অবস্থান এতে প্রতিফলিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত নয়।
________________________________
নিবন্ধটি আল জাজিরা ইংরেজিতে India’s aggression is fuelling Kashmiri resistance শিরোনামে প্রকাশিত। লেখিকা রুওয়া শাহ তুরস্কে সিনেমা ও টেলিভিশন নিয়ে পড়াশুনা করছেন। এর আগে তিনি ভারতে সাংবাদিকতা করতেন। ছবি আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।


Happy

Happy

0 %


Sad

Sad

0 %


Excited

Excited

0 %


Sleepy

Sleepy

0 %


Angry

Angry

0 %


Surprise

Surprise

0 %

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments