Monday, June 14, 2021
0 0
Homeমধ্যপ্রাচ্যইরানকেন্দ্রিক দ্বন্দ্বই কি পাশ্চাত্যকে ভাঙবে?

ইরানকেন্দ্রিক দ্বন্দ্বই কি পাশ্চাত্যকে ভাঙবে?

Read Time:10 Minute, 52 Second

মার্ক লিওনার্ড, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
ফ্রান্সের বিয়ারিতজ শহরে অনুষ্ঠিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের আগে সবার আগ্রহের বিষয় ছিল, কার পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় বিঘ্নতা আসছে, মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের, নাকি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের পক্ষ থেকে? যদিও সম্মেলনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এমন একজন, যার উপস্থিতিই আদতে প্রত্যাশিত ছিল না, তিনি: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ।
যদিও এই সম্মেলনে গণমাধ্যমের চোখ ছিল বাণিজ্য যুদ্ধ, আমাজনের আগুন এবং বিপজ্জনক “চুক্তিবিহীন” ব্রেক্সিটের উপর, তবে সবচেয়ে ফলপ্রসু আলোচনা হয়েছে সম্ভবত ইরানের বিষয়ে। ইরানের সাথে হওয়া ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির ভাগ্য দুনিয়ার সবচেয়ে উত্তপ্ত অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে কিনা সেটা যেমন নির্ধারণ করতে পারে, তেমনি পশ্চিমা রাজনৈতিক জোট টিকে থাকবে কিনা, তাও নির্ধারণ করতে পারে।
বিয়ারিতজে ফরাসি রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈরিতা নিরসনের উদ্যোগের সূচনা করেছেন। এবং সাম্প্রতিক দিনগুলিতে ইরান নাটকের মূল খেলোয়াড়রা সকলেই পিছনের দিকে ফিরছেন। যুক্তরাজ্য জিব্রাল্টার থেকে আটককৃত ইরানের ট্যাংকার (গ্রেস ১) ছেড়ে দিয়েছে। এবং, আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প সাহেব ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রোহানির সাথে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, এমনকি তিনি এও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের স্বল্পমেয়াদি “লাইন অব ক্রেডিট অথবা লোন” পাওয়ার বিষয়েও তিনি আপত্তি করবেন না।
তবু অনেকগুলো বিষয় উত্তেজনা নিরসনের উদ্যোগকে বাধাগ্রস্থ করতে পারে। প্রথমেই, ট্রাম্প প্রশাসন এখনো মনে করে যে ইরানের (এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের) উপর যত বেশি চাপ প্রয়োগ করা হবে, ততই ভালো হবে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টন ইরানের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে চান, এবং তিনি মনে করেন, ইউরোপীয় সহযোগিতার পথ বন্ধ করার মাধ্যমেই এটি করতে হবে। তিনি এবং অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের সাথে ইউরোপের ঐক্য নষ্ট করতে সব উপায় অবলম্বন করবেন, এবং স্পষ্টতই তারা সবচেয়ে বেশি চাপ প্রয়োগ করবেন যুক্তরাজ্যের উপর। আরো জঘন্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের কেউ কেউ এবং মধ্যপ্রাচ্যেরও কেউ কেউ অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি ইরানকে সামরিক বিভ্রান্তিতে ফেলার জন্য ফাঁদ বানাতে চায়।
ইরানি কট্টরপন্থীদের নিয়েও সমস্যা আছে। তাদের অনেকেই মনে করেন, পারমাণবিক চুক্তি থেকে তারা কিছু্ই পাননি, এবং তাদের মতে উদ্দেশ্য সাধনের উপায়টিই বড় ঝামেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ইরানি নেতারাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে চুক্তি বিরোধী কাজে উৎসাহী হয়ে পড়েছে, শুধু যে হরমুজে ব্রিটিশ ট্যাংকার দখল করেছে, সেটিই্ এ ধরনের একমাত্র কাজ নয়। (ইউরোপে ইরানেরও পছন্দের ক্ষেত্র যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রেরই মতো।)
ইরানের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী মনোভাব ইসরায়েলেরও উদ্বেগ বৃদ্ধি করছে, যার ফলে ইরাকে তারা ইরানের সম্পত্তিসমূহকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। (ইতিমধ্যে সিরিয়ায় ইরানি বাহিনীর উপর হামলা শুরু করে দিয়েছে।)
বোধগম্য কারণেই ইরান ইনসটেক্স উদ্বোধনে ইউরোপের ধীর গতির কারণে হতাশ হয়ে পড়েছে। ইনসটেক্স মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইউরোপ-ইরান বাণিজ্য সম্ভব করে তোলার একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু ইরানের যারা দাবি করছেন যে, তারা ইউরোপ থেকে কিছুই পাননি, তারা একেবারেই ভুল দাবি করছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি তাদের বর্তমান অবস্থান পরিত্যাগ করে ইরানকে চেপে ধরার ব্যাপারে ট্রাম্পের সাথে যোগ দিত, তাহলে তারা পার্থক্যটা স্পষ্টতই বুঝতে পারতেন। আসলে তীব্রতাবৃদ্ধির নীতি অব্যাহত রাখার মাধ্যমে ইরান নৈতিক উচ্চ অবস্থান হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে, একই ভাবে তারা সেই সকল ইউরোপীয়দের সমর্থন হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ইরান-নীতি থেকে ভিন্ন ইরান নীতি মানতে চাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে পাত্তা না দিয়ে চুক্তির বিষয়ে ইরানকে চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপ যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, তা অনেককে বিস্মিত করেছে। এমনকি বলতে গেলে ব্রিটিশ সরকারও ইইউর সাথেই আছে এ বিষয়ে। কিন্তু এটা পরিবর্তন হতে পারে। ইরান যদি ব্রিটেনের আরেকটি জাহাজ আটক করে, এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের জিম্মি করে রাখে, তাহলে এর ফলে জনসন ইইউ’র সঙ্গত্যাগ করে ট্রাম্পের সাথে যোগ দিতে পারে।
এই ঝুঁকি সত্ত্বেও হতাশার বিষয় হলো, ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্য পারস্য উপসাগরে একটি যৌথ ইউরোপীয় মিশন চালু করতে পারেনি, যাতে তাদের যে কারো উপর আক্রমণ হলে সেটি সকলের উপর আক্রমণ বলে গণ্য হতে পারে। যুক্তরাজ্য যদি ইরান ইস্যুতে ইইউ’র পথ থেকে সরে যায়, তাহলে পরবর্তী কট্টরপন্থীদের (ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র- দুই দেশেরই) লক্ষ্যবস্তু হবে জার্মানকে সরানো। একই সাথে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারে, সেখানে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রসমূহ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চলে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
এসকল ঝুঁকি ভালো মতন মোকাবেলা করার জন্যে ম্যাক্রোঁ ট্রাম্পকে বলেছিলেন যে, ইরান যদি আরেকবার তাদের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম হ্রাস করার মাধ্যমে চুক্তিতে আসতে রাজি হয় এবং পাশ্চাত্যের সাথে আলোচনার দুয়ার খোলে দেয়, তাহলে ট্রাম্প যেন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। … … এই ক্ষেত্রে স্মর্তব্য যে, ট্রাম্প আমেরিকার অনন্তকালব্যাপী এবং বিদেশে অযৌক্তিক অভিযানসমূহ যুদ্ধসমূহ সমাপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
ইউরোপীয়দেরকেও অবশ্যই ইরানকে বুঝাতে হবে, যেন সে নিজের ক্ষমতাকে অতিমাত্রায় বড় করে না দেখে। একটি নতুন ক্রেডিট লাইনের বিষয়ে ম্যাক্রোঁর প্রস্তাব হয়তো ইরানের মধ্যপন্থীদের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে, কিন্তু ইউরোপীয়রা যদি ইনসটেক্স চালু করতে এবং চালাতে সক্ষম না হয়, তবে ইরানিদের নিকট তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতাই শেষ হয়ে যাবে। সর্বাবস্থায়, লক্ষ্য হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অবধি ইরানকে নীরব থাকতে উৎসাহিত করা। ইউরোপেরে উচিত ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করা, তবে এ বিষয়টিও স্পষ্ট করতে হবে, যে ইউরোপীয় স্বার্থে ইরান যদি আর কোন আক্রমণ করে, তাহলে ইইউ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের মতোই নিয়ন্ত্রণ কৌশল অবলম্বন করতে বাধ্য হবে।
সর্বোপরি, পারস্য উপসাগরে ইউরোপের তীক্ষ্ম নজরদারি রাখা দরকার। এমনকি তারা যদি যুক্ত নৌশক্তি সংগঠিত নাও করে, তাদের উচিত হবে উত্তেজনা হ্রাসে কাজ করা, যদি যুক্তরাষ্ট্র অথবা ইরান কোন সম্মুখ দ্বন্দ্বের জন্য প্ররোচিত করতে চায়। ইরানকে সাথে নিয়ে নৌ-মহড়ার আয়োজন করা এক্ষেত্রে চমৎকার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে।
বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে, এই কৌশল মাথায় রেখেই সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন ম্যাক্রোঁ। কৌশলটি সফল হলে ট্রাম্পের আমলে বিয়ারিতজ সম্মেলনই হবে প্রথম সফল জি৭ সম্মেলন। (সেটা ট্রাম্প জানুন কিংবা নাই জানুন।)
________________________________
নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে Will the Iran Conflict Break the West? শিরোনামে প্রকাশিত। লেখক মার্ক লিওনার্ড বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক ইউরোপীয় কাউন্সিলের পরিচালক। সংযুক্ত ছবিটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।

Happy

Happy

0 %


Sad

Sad

0 %


Excited

Excited

0 %


Sleepy

Sleepy

0 %


Angry

Angry

0 %


Surprise

Surprise

0 %

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments