Monday, June 14, 2021
0 0
Homeমধ্যপ্রাচ্যট্রাম্পের হঠকারিতার সর্বোচ্চ নজির...

ট্রাম্পের হঠকারিতার সর্বোচ্চ নজির…

Read Time:10 Minute, 27 Second

জনাথন কুত্তাব, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
বিদেশ-নীতি বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সব চেয়ে জঘন্য সিদ্ধান্ত কোনটি? প্যারিস পরিবেশ চুক্তি প্রত্যাহার করে নেওয়াটা খারাপ ছিল। ২০১৫ সালের ইরান পরমাণু সমোঝতা থেকে বেরিয়ে এসে যুক্তরাষ্ট্র এই সংকেত দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র পূর্ববর্তী প্রশাসনের স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহের বিষয়ে শ্রদ্ধাশীল নয়। অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকার কর্তৃক সফলভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে যে হুমকি দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্ব ব্যবস্থা ও বিশ্ব শান্তির জন্য ভয়াবহ ফল বয়ে আনতে পারে।
কিন্তু সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। মার্চের পঁচিশ তারিখ গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের প্রতি স্বীকৃতি দিয়ে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রচলিত শিষ্টাচারের অন্যতম একটি মূলনীতি জোরপূর্বক কোন অঞ্চল দখলের অগ্রহণযোগ্যতাকে পরিত্যাগ করেছেন, অথচ এই মূলনীতিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করছে। ইসরায়েলের এই দখলদারিত্বের প্রতি ট্রাম্পের স্বীকৃতি মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলের জন্য এক ভয়ানক নজির স্থাপন করেছে।
১৯৪৫ সালের পর থেকে বিশ্বের সকল দেশ কোন দেশ কর্তৃক তার দূর্বল প্রতিবেশীদের উপর হামলা ও দখলদারিত্বকে নিরুৎসাহিত করতে সর্বসম্মতিক্রমে জোরপূর্বক রাষ্ট্রের সীমা বৃদ্ধিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই মূলনীতি লঙ্ঘন করে যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে (যেমন কুয়েতে ইরাকের আক্রমণ, উকরাইনে রাশিয়া এবং পূর্ব জেরুজালেম ও গোলানে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব) সারা দুনিয়া সেটার নিন্দা করেছে।
১৯৬৭ সালে মধ্যপ্রাচ্যের ছয় দিনের যুদ্ধের পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের ২৪২ নং রেজুলেশনের প্রস্তাবনায় এই মূলনীতিটি অন্তর্ভুক্ত ছিল, এই যুদ্ধে ইসরায়েল সিরিয়ার নিকট থেকে গোলান মালভূমি দখল করে। মধ্য নব্বই থেকে এটি আন্তর্জাতিক আইনেরও অন্যতম অপরিহার্য মূলনীতি।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে বলছেন যে ইসরায়েল একটি “আত্মরক্ষামূলক” যুদ্ধে গোলান মালভূমি দখল করেছে। তাছাড়া তারা আরো বলছেন, সিরিয়া একটি গৃহযুদ্ধে লিপ্ত, এবং দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান, রাষ্ট্রপতি বাশার আল-আসাদ এই ভূমি ফেরত পাওয়ার অধিকার রাখেন না।
কিন্তু আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের যুক্তি আসলে ধোপে টিকে না। অনেক পশ্চিমা সরকার, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং আইন বিশেষজ্ঞরা কয়েকজন ইসরায়েলি বিশেষজ্ঞসহ বলছেন জোরপূর্বক কোন এলাকা দখল করাকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনে আক্রমণাত্মক ও রক্ষণাত্ম যুদ্ধের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
তার মূল কারণ হলো যে কোন যুদ্ধে দুই পক্ষ দাবি করতেই পারে যে তারা আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করছে। যেমন ছয় দিনের যুদ্ধ সম্পর্কে ইসরায়েল এ কথা মেনে নিচ্ছে যে সাতষট্টির জুন মাসে আগ বাড়িয়ে যুদ্ধ শুরু করেছে, কারণ হিসেবে বলছে তারা মিসরের পক্ষ থেকে হামলার ভয় করছিল, অন্যদিকে আরবরা এর বিরোধিতা করে সাধারণত বলে যে ঐ সংঘাতটি ছিল তাদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন।
গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে ট্রাম্পের স্বীকৃতি ইতোমধ্যে একটি অস্থিতিশীল প্রভাব ফেলেছে। গোলানের বিষয়ে সিদ্ধান্তের পর নেতানিয়াহু ওয়াশিংটন থেকে ফিরেই পশ্চিম তীর দখলের কথা বলতে শুরু করেছেন। এরকম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে সেটা দুই-রাষ্ট্র সমাধানের ভিত্তিতে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিবে।
তাছাড়া ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত অন্যান্য রাষ্ট্রকেও তাদের প্রতিবেশীদের সাথে বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে বিরোধ জোরপূর্বক সমাধান করার বিষয়ে এক ধরনের সবুজ সংকেত প্রদান করে। যুদ্ধের মাধ্যমে দখলিকৃত ভূমি যদি আইনসম্মত হয়, তাহলে রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়া দখল, ইয়েমেনের কিছু অংশে সৌদির দাবি, কিংবা কুয়েতকে ইরাক কর্তৃক তাদের ১৯তম জেলা দাবি করার বিষয়কে আরো শক্ত করে তুলবে। আফ্রিকা, এশিয়া এবং ইউরোপের আরো অনেক দেশ প্রতিবেশী দেশের বিভিন্ন অংশ জোরপূর্বক দখল করতে প্রলুব্ধ হবে, যে সকল অঞ্চলে তাদের কোন ধরনের ঐতিহাসিক বা জাতিগত দাবি রয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের দখলাদারিত্বের স্বীকৃতি সেখানকার সিরীয় জনগণের জন্য আন্তর্জাতিক আইনী আশ্রয়কে বিপন্ন করবে। এ সকল আইনের মধ্যে রয়েছে ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন, যার মূল লক্ষ্য হলো শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং দখলদার বাহিনী তাদের ভূমি ছেড়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যুদ্ধাবস্থায় সামরিক দখলের অধীনে থাকা বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অংশত, এই কনভেনশন দখলদার কর্তৃক তাদের বেসামরিক নাগরিকদেরকে দখলিকৃত ভূমিতে স্থানান্তরিত করতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে (এ কারণে ইসরায়েলি বসতি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ)। দখলিকৃত ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইসরায়েলি স্থাপনার সম্পর্কে ২০০৩ সাধে আন্তর্জাতিক কোর্ট অব জাস্টিসের দেওয়া একটি সিদ্ধান্তে এ বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তাছাড়াও কোন দখলদার শক্তি দখলিকৃত দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবসৃষ্ট সম্পদ, এবং অন্যান্য সম্পত্তি বৈধভাবে গ্রহণ করতে পারে না। আর দখলিকৃত ভূমি দেশের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলা পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
কয়েক দশক ধরে ডেমক্র্যাটিক ও রিপাব্লিকান প্রশাসনসমূহ ইসরায়েলের প্রতি তাদের সব ধরনের সমর্থন সত্ত্বেও পূর্ব জেরুজালেম ও গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের একতরফা পদক্ষেপসমূহকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল। তারা জেনেভা কনভেনশনের আইনসমূহ প্রয়োগের ব্যাপারেও জোর দিচ্ছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন বেপরোয়াভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ কাল থেকে চলে আসা নীতির বিপরীতে চলছেন। ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলি অবৈধ দখলদারিত্বের অস্তিত্বকে অস্বীকার করছে, যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরিত করেছে, গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্তিকরণকে স্বীকৃতি দিয়েছে, এবং পশ্চিম তীর দখল করার বিষয়ে নেতানিয়াহুর পরিকল্পনার বিষয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করছে।
আমেরিকা যে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি শান্তি পরিকল্পনার প্রস্তুতির কথা বলছিল, ট্রাম্পের পদক্ষেপ সে পরিকল্পনাকে সত্যিকার অর্থে কোন সহযোগিতা করবে না বললেই চলে। আর গোলান মালভূমির বিষয়ে তার এই হঠকারিতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যেও সীমাবদ্ধ থাকবে না। ট্রাম্পে জঘন্যতম বিদেশ-নীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক ফলাফল সম্ভবত এখনো সামনে আসেনি, তবে আসার অপেক্ষায় আছে।
________________________________

লেখক ফিলিস্তিনের রামাল্লা ভিত্তিক স্বাধীন মানবাধিকার সংগঠন আল-হক’র সহপ্রতিষ্ঠাতা। এই নিবন্ধটি “The Heights of Trumps Recklessness” শিরোনামে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশ হয়েছে। ছবি প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংগৃহীত।

Happy

Happy

0 %


Sad

Sad

0 %


Excited

Excited

0 %


Sleepy

Sleepy

0 %


Angry

Angry

0 %


Surprise

Surprise

0 %

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments