Wednesday, September 22, 2021
0 0
Homeশীর্ষ খবরভূয়া খবরের ‍গুরুত্ব...

ভূয়া খবরের ‍গুরুত্ব…

Read Time:13 Minute, 5 Second


জশ ফ্রাইডম্যান, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
৯০ দশকে একবার ইথিওপিয়া ভ্রমণের সময় আমি সাংবাদিকদেরকে কারাগারে ঢুকানো বন্ধ করতে রাজি করার জন্যে সেখানকার তদানন্তীন প্রধানমন্ত্রী মেলেস জেনাওয়ির সাথে দেখা করেছিলাম মাত্র কয়েক বছর পূর্বে জেনাওয়ির গেরিলারা সোভিয়েতসমর্থিত স্বৈরশাসককে উচ্ছেদ করেছিলো, কাজেই সেখানে তুমুল উচ্ছাস বিরাজ করছিল, এবং মাঝে মাঝে ছোটখাট পত্রিকাগুলো জেনাওয়ির বিরুদ্ধে ভুলবাল আক্রমণ করতো কাজেই তিনি একটি নয়া আইন প্রণয়ন করলেন, যেটির মাধ্যমে তিনি তার ভাষায়সরকারঅবমাননাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করলেন, এবং ধরনের বিভ্রান্তিমুলক সংবাদের জন্য সাংবাদিকদেরকে জেলজরিমানার মুখোমুখি করতে শুরু করলেন
এখন নতুন সংস্কারপন্থী প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের নেতৃত্বে, যিনি মাত্র এক বছর হলো ক্ষমতায় এসেছেন, ইথিওপিয়া কারাবন্দী সাংবাদিকদের মুক্তি প্রেসের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহারে এতোটাই সাফল্য অর্জন করে যে ইথিওপিয়া ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে আয়োজন করছে
কিন্তু এতোটুকু পড়েই খুব খুশি হইয়েন না কিছু সংখ্যক মুক্ত পত্রিকা এখন প্রায়ই অসত্য খবর ছাপাচ্ছে, যা জাতিগত গোত্রীয় শত্রুতাকে উস্কে দিচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রী আহমেদকে আক্রমণ করছে ১৫ বছরের মধ্যে প্রথম অবাধ নির্বাচন আগামী বছর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, ফলে তিনি এখন ঠিক সেই পরিস্থিতির মধ্যে আছেন, যে পরিস্থিতিতে ইতোপূর্বে ছিলেন জেনাওয়ি এবং সংবাদপত্রের উপর থেকে যে সকল নিয়ন্ত্রণ তিনি প্রত্যাহার করেছিলেন, তার মধ্যে কয়েকটি আবার ফিরিয়ে আনার চিন্তাভাবনা করছেন
কিন্তু এমনটা করার আগে তার উচিত হবে জেনাওয়ির পদক্ষেপ এবং সেটা থেকে অর্জিত শিক্ষা খুব ভালো করে অনুধাবন করা, আর তা হলো: সাংবাদিকরা অদমনীয়, তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে দীর্ঘ মেয়াদে কোন কিছুই অর্জন করা সম্ভব নয় বাস্তবে এটা কেবল আরো বেশি পেশাদারি সংবাদ মাধ্যমের উন্মেষকে বিলম্বিত করবে মাত্র
জেনাওয়ি তার সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে একটি সহজ ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিলেন তিনি আমাকে বলেছিলেন, “আমাদের সাংবাদিকরা যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইউরোপের সাংবাদিকদের মতো পেশাদার নন কীভাবে ঠিকটাক মতো প্রতিবেদন করতে হয়, তা তারা জানেন না তারা যতক্ষণ না তাদের কাজ করার সঠিক পন্থা জানবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা অবশ্যই তাদের জন্য দিকনির্দেশনা ঠিক করে দিতে হবেজেনাওয়ি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, হয়তো ভুয়া খবরের বিরুদ্ধে তিনি বিষেদ্গার করতেন
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বব্যাপী মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য কাজ করতে গিয়ে এবং কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টের প্রথম দিককার সভাপতি হিসেবে আমি জেনাওয়ির মতো যুক্তি বহুবারই শুনেছি উদীয়মান গণতান্ত্রিক দেশসমূহের অনেক সাংবাদিক সরকারি কর্মকর্তারা প্রায়ই কথার উপর গুরুত্ব দেন যে, সাংবাদিকরা নিজে থেকে দায়িত্বশীলতার সাথে সাংবাদিকতা করতে সক্ষম হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত রাষ্ট্রকে দিয়ে তাদেরকে বাধ্য করতে হবে কিন্তু পদ্ধতি একটি বিশ্বাসযোগ্য মুক্ত সংবাদ মাধ্যমের বিকাশে সহযোগিতা করার বদলে সেটিকে আরো বাধা দেয়
জেনাওয়ির সাথে বৈঠকের পর থেকে আমি অপর্যাপ্ত পেশাদারি সাংবাদিকতা সংবাদ মাধ্যমের উপর নিপীড়নকে বৈধতা দেয় তার এই দাবির পক্ষে ঐতিহাসিক প্রমাণ খুঁজতে শুরু করলাম; যাতে পরবর্তী সফরে আমি তার যুক্তি খণ্ডন করতে পারি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আমি একটা নজির খোঁজে পেলাম আসলে ভয়ঙ্কর এবং বিস্ময়করভাবে জেনাওয়ির জগৎ আর আঠারো শতকের মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামসের এবং তার ফেডারেলিস্টসদের জগৎ একই রকম, যিনি নতুন দেশের রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে অবাধ উদ্যোমী গণমাধ্যমের প্রকাশ্য সমালোচনার নিন্দা করতেন, চাই সেটা সঠিক হোক কিংবা ভুল হোক
অসংযত গণমাধ্যম আমেরিকার ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলবে, এই যুক্তিতে অ্যাডামস ১৭৯৮ সালে সাময়িকভাবে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, যখন তিনি অ্যালিয়েন অ্যান্ড সেডিশন অ্যাক্টস স্বাক্ষর করেন, এই আইনটি সরকারের বিরুদ্ধেমিথ্যা, মানহানিকর বিদ্বেষপ্রসূত লেখালেখি লেখা, ছাপা করা, বলা কিংবা প্রকাশ করারঅপরাধে সাংবাদিকদের জেলজরিমানার বিধান জারি করেন এরপর ২০টি পত্রিকার সম্পাদক কারাবরণ করেন
কিন্তু থমাস জেফারসন এবং তার ডেমক্র্যাটিকরিপাবলিকানরা ফেডারেলিস্টদেরকে কংগ্রেস এবং আদালত উভয় স্থানে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন এবং সৌভাগ্যবশত, যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিক জেফরসন ১৮০০ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন দুই বছরের মধ্যে অ্যালিয়েন অ্যান্ড সেডিশন আইনের বিধানসমূহ হয়তো মেয়াদোত্তীর্ণ হয়, না হয় বাতিল করা হয় এর ফলে মার্কিন গণমাধ্যমের জন্য পরীক্ষানিরীক্ষা করার দুয়ার উম্মোচিত হয়, ফলশ্রুতিতে দুই শতকেরও বেশি সময় ধরে  গভীর যথাযথ সাংবাদিকতার সংস্কৃতির উন্নয়ন ঘটে, এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে ফ্যাক্টচেকের সংস্কৃতিও গড়ে উঠে
গতিশীল মুক্ত গণমাধ্যম অর্জনের কোন সংক্ষিপ্ত পথ নেই; ভুলভ্রান্তি শুধরে পেশাদারি সাংবাদিকতার প্রতিষ্ঠান আদবকেতা গড়ে উঠতে অনেক লম্বা সময়ের প্রয়োজন রাজনীতিবিদদেরকে অবশই এই প্রক্রিয়ার উপর বিশ্বাস রাখতে হবে, এবং সে জন্য নিজেদের চামড়া বেশ মোটা করতে হবে নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম স্বল্পমেয়াদে নেতাদের জন্য যদিও ফায়দা বয়ে আনে, দীর্ঘকালীন প্রতিক্রিয়া হিসেবে এর ফলে একটি দেশের গণমাধ্যমের উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হয়ে পড়ে
এই বিষয়টির একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রমাণ হলো: ১৭৮৯ সালে যখন ফরাসি বিপ্লব শুরু হয়, গণমাধ্যমের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করা হয় চার বছর পর, দেশটিতে চার শতাধিক পত্রিকা প্রতিষ্ঠিত হয়, শুধুমাত্র প্যারিসেই ছিল ১৫০ টি ১৭৯৯ সালের মধ্যে সারা দেশে এই সংখ্যাটি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ,৩০০ তে এই ,৩০০ টি পত্রিকায় সাংবাদিকরা তাদের নৈপুণ্য অর্জন করেন
কিন্তু এই বিপ্লবও দমনমূলক হয়ে পড়ে ১৭৯৯ সালে নেপোলিয়ান ক্ষমতায় আসার সময় প্যারিসের মোট পত্রিকার সংখ্যা ৭২ নেমে আসে, খুব তাড়াতাড়ি সে সংখ্যাটিকে আরো কমিয়ে ১৩তে নামিয়ে আনেন, এবং তারপর ১৮১১ সালে প্যারিসের পত্রিকার সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ৪টি
একইভাবে, সোভিয়েত ইউনিয়নের ধ্বংসের পর সব ধরনের গণমাধ্যম ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায় কিন্তু নবগঠিত কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্র গণমাধ্যমের জন্য নির্দেশনা দরকার এই ধারণাটিকে গ্রহণ করে অনেকগুলো আইন প্রণীত হয়, যেগুলো সম্পর্কে বলা হতো যে এগুলোর উদ্দেশ্য মুক্ত গণমাধ্যম নিশ্চিত করা, কিন্তু বাস্তবে সেগুলোতে আক্রমণাত্মক বিশ্লেষণী সাংবাদিকতার জন্য সাংবাদিকদেরকে শাস্তি দেওয়া হতো ব্যাঙ্গ রচনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল অনেক স্বাধীন প্রকাশনী, ব্রডকাস্টার ব্লগারদেরকে মোটা অংকে জরিমানা করা হয়
চীন এবং তুর্কি দুই দেশই সাংবাদিকদের জেলে ঢুকানোতে অলিম্পিক গেইমস বিজয়ী পর্যায়ের সম্প্রতি গণমাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ আরো বৃদ্ধি করেছে মাত্র গতমাসে রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি নয়া আইন স্বাক্ষর করেছেন, যেটিতে তথাকথিত ভুয়া খবর তথ্য, যা রাষ্ট্রের জন্যঅসম্মানজনক”, সেগুলো প্রচার করার জন্য ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিকদের এবং অনলাইন মিডিয়াকে শাস্তির আওতায় আনার বিধান রয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও একই পথে হাঁটার চেষ্টা করছেন তিনি যেভাবে নিয়মিত সাংবাদিকদেরকেমিথ্যাবাদীজনগণের শত্রুতকমা দিচ্ছেন, তাতে মিডিয়ার জন্য নাৎসিদের পছন্দের তকমা: “দ্য লুগেনপ্রেস” (মিথ্যাবাদি সংবাদমাধ্যম) এর প্রতিধ্বনি হচ্ছে
এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নেও, ২০১৪ সালের ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণা অনুসারে, ব্যাঙ্গ করার অপরাধে সরকারকে অপমান করার অপরাধে সাংবাদিকদের জেল হয় আইপিআইর গবেষণায় দেখা যায়: “ইইউর বেশির ভাগ রাষ্ট্র ক্রিমিনাল ডিফেমেশন প্রভিশন্স মেনে চলে, যেটিতে সম্ভাব্য শাস্তি হিসেবে রয়েছে কারাদণ্ড বিচার কার্য এখনো চলমান রাখা হচ্ছে, এবং সাংবাদিকদের ফৌজদারি দণ্ডে দণ্ডিত করা হচ্ছে
গণমাধ্যমকে ভুল পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানোর, ভুল করার, এবং ভুলসমূহ থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ দেওয়াটা বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে কারণে সরকার নাগরিক সমাজের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে মুক্ত গণমাধ্যমকে সহযোগিতা করার বিষয়ে সতর্ক থাকা, এমনকি অথবা বিশেষত যদি সে গণমাধ্যম হয়ে থাকে উন্নয়নশীল
________________________________

জশ ফ্রাইডম্যান একজন পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী সাংবাদিক তার লেখাটিThe Value of Fake Newsশিরোনামে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত হয় ছবি: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংগৃহীত

Happy

Happy

0 %


Sad

Sad

0 %


Excited

Excited

0 %


Sleepy

Sleepy

0 %


Angry

Angry

0 %


Surprise

Surprise

0 %

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments