Wednesday, September 22, 2021
0 0
Homeশীর্ষ খবরভারতীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ও আমাদের শঙ্কা

ভারতীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ও আমাদের শঙ্কা

Read Time:9 Minute, 55 Second

নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়, আল জাজিরা ইংরেজি:
ভারতের সাধারণ নির্বাচনের আগের সপ্তাহের জনমত জরিপেই দেখা গিয়েছিল, স্বচ্ছ নির্বাচন হলেও নরেন্দ্র মোদির আবার প্রধানমন্ত্রী বিজয়ী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের সাথে সামরিক উত্তেজনার পর থেকে তিনি সামরিক জাতীয়তাবাদের চূড়ায় আরোহণ করছিলেন।
তবু কেউ কেউ আশা করছিলেন শেষ পর্যন্ত হয়তো স্রোত বিরোধীদের দিকে ঘোরতে পারে। আনুষ্ঠানিক ফলাফল ২৩ মে প্রকাশিত হয়েছে। ফলাফল এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তার বিশ্বস্ত সহযোগী ও দলীয় প্রধান অমিত শাহের নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়েও ভালো হয়েছে: সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভার ৫৪৩ আসনের মধ্যে তারা পেয়েছেন তিন শতাধিক আসন।
বিজেপি তাদের জোটের অন্যান্য দলকে সাথে নিয়ে জিতেছে ৩৫৩ আসন, এর ফলে গত কয়েক দশকের মধ্যে মোদিই হতে যাচ্ছেন প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি এক মেয়াদ সম্পূর্ণ করে আরেক বার সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকারে ফিরছেন।
নির্বাচনী বিজয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোদী শুধু আরেক মেয়াদ ক্ষমতাই নিশ্চিত করেন নি (আবারও তিনি তার জোটসঙ্গীদেরকে খুব কমই গুরুত্ব দিবেন), বরং সেই সাথে তিনি তাঁর হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নিয়ে এগুনোর পক্ষে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সমর্থনও পেয়েছেন।
ঠিক এই জায়গাতেই ভবিষ্যতে ভারতের জন্য কী অপেক্ষা করছে, তা নিয়ে ভয়ের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
গত মার্চে বিজেপির গেরুয়া পোশাকধারী আইন প্রণেতাদের একজন হিন্দু ডানপন্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী সাক্ষী মহারাজ একটি ভীতিকর ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেন, “মোদী একটি সুনামির নাম, যা পুরো দেশকে জাগিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, এই নির্বাচর সম্পন্ন হওয়ার পর ২০২৪ সালে আর কোন নির্বাচন হবে না।”
অনেকে এই কথার অর্থ তুলেছেন এভাবে যে আগামী পাঁচ বছরে মোদী তার ক্ষমতা এমনভাবে শক্তিশালী করবেন যে অন্য কোন রাজনৈতিক শক্তিই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্ষম হবে না। এই বক্তব্য এই ভয় তৈরি করছে যে বিজেপি হয়তো সংসদীয় ব্যবস্থাকে অনির্বাচিত ব্যবস্থা দিয়ে পরিবর্তিত করার জন্য আইনে পরিবর্তন আনার কথা বিবেচনা করতে পারে।
যদিও মহারাজের বক্তব্যকে বিজেপির বেশির ভাগ নেতা বিচ্ছিন্ন অসংলগ্ন বক্তব্য হিসেবে দেখাচ্ছেন, তবু এই বক্তব্য শাসক দলের সুদূরপ্রসারী উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়।
ঠিক এইখানে ভারতীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করাটা যৌক্তিক বলে প্রতীয়মান হয়, এবং এর পিছনে কমপক্ষে তিনটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, মোদী এই বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যে তিনি হিন্দু কট্টর ডানপন্থাকে বাধা দেবেন না। বিজেপি মহারাজ এবং তার মতো অসংলগ্ন মন্তব্য করার প্রবণতা আছে এমন অনেককেই পুনরায় মনোয়ন প্রদান তো করেছেই, উপরন্তু এমন একজন প্রার্থীকেও নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছে, যিনি বর্তমানে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ মোকাবেলা করছেন।
প্রজ্ঞা ঠাকুর, যিনি ২০০৮ সালের মালেগাও বোমা হামলার জন্য অভিযুক্ত, মধ্যপ্রদেশের নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছেন, তিনিই প্রথম ভারতীয় সাংসদ, যিনি “সন্ত্রাস” হিসেবে অভিযুক্ত থাকা অবস্থায় সংসদে একটি আসন নিশ্চিত করেছেন নিজের জন্য। দেশব্যাপী ক্ষোভ সত্ত্বেও মোদীসহ বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতারা তাকে মনোনয়ন প্রদানের সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।
প্রজ্ঞা ঠাকুর মহাত্মা গান্ধীর ডানপন্থী ঘাতকের গুণগান করে বিজেপি নেতৃত্বকে বিব্রত করতে শুরু করেছেন, আগামী দিনে মোদীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তিনি প্রজ্ঞাকে দল থেকে বহিষ্কার করবেন কি করবেন না। তার বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বুঝা যাবে যে, দলের নেতৃত্ব বিভক্ত কণ্ঠে কথা বলে এবং বিজেপি তাদের দ্বিতীয় মেয়াদেও কট্টর ডানপন্থার পক্ষে সমর্থন অব্যহত রাখবে।
মোদীর বিজয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার দ্বিতীয় কারণ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা সংরক্ষণের ব্যাপারে বিজেপির অতীত রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়। প্রথম মেয়াদে বিজেপি বিচার বিভাগ ও আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে বহুবার নাক গলিয়েছে। বিচারকগণ এবং তদন্তকারীরা প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন যে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ভারতীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়ের তৃতীয় কারণ হলো রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সাথে মোদীর আদর্শিক সম্পর্ক, যে সংঘ কিনা আবার বিজেপির আদর্শিক উৎসও বটে। মোদী নিজেও বহু বছর এই সংঘের সদস্য ছিলেন। আরএসএস যে মূলনীতি মেনে চলে তা হলো “এক চালক অনুবর্তীত্ব”, সংস্কৃত এ কথাটির অর্থ “এক নেতার অনুসরণ”, এই সংঘ গণতান্ত্রিক মূলনীতি পরিহার করে চলে।
মোদী নিজেও আরএসএসের আদর্শিক গুরু দীনদয়াল উপাধ্যায়ের অনুসারী, যার তত্ত্বগ্রন্থ “অখণ্ড মানবতা”, বিজেপির দার্শনিক গাইডবুকসমূহের একটি। এই অভিসন্ধর্ভে উপাধ্যায় জাতীয়তাবাদের পশ্চিমা ধারণা, পশ্চিমা সেক্যুলারিজম ও পশ্চিমা গণতন্ত্রের ভারতীয়করণের উপর জোর দিয়েছেন”। যদিও তিনি ভারতীয় গণতন্ত্রের রূপরেখার মধ্যে রাজনৈতিক আলাপকে সমর্থন করেছেন, লিখেছেন, “আমরা যদি এটাকে আরেক কট্টরপন্থায় নিয়ে যাই, তবে সেটা হয়তো সমস্যা বলে প্রতীয়মান হতে পারে।”
উপরের সব কয়টি কারণ হিন্দু কট্টর ডানপন্থার সমর্থন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসকরণ এবং অগণতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি আনুগত্য  মোদীর দ্বিতীয় মেয়াদে দেশকে এক জাতির কর্তৃত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী।
খুব স্বাভাবিকভাবেই, বিজেপি মোসলমানদেরকে রাজনৈতিক স্পেস কিংবা প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ প্রদানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। বিজেপির কৌশল হলো মোসলমানদেরকে রাজনৈতিকভাবে এড়িয়ে চলা এবং স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী হিসেবে তাদেরকে স্বীকার না করা।
মোদী যেহেতু তার হিন্দু জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে গঠিত সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী নীতি নিয়ে এগুচ্ছেন, বহুজাতিক রাষ্ট্র ভারত ক্রমবর্ধমান হারে বিভক্ত হতে থাকবে। পুরো দেশের উপর সংখ্যা গরিষ্ঠ হিন্দুদের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিজেপি দুনিয়ার সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষষ্ট্রের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে ফেলবে।
________________________________
লেখক দিল্লী ভিত্তিক লেখক ও সাংবাদিক। তার বিশেষ আগ্রহের বিষয় হলো হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। নিবন্ধটি আল জাজিরা ইংরেজিতে “Should we fear for India’s democracy?” শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। ভাষান্তর কর্তৃক গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকু অনূদিত।

Happy

Happy

0 %


Sad

Sad

0 %


Excited

Excited

0 %


Sleepy

Sleepy

0 %


Angry

Angry

0 %


Surprise

Surprise

0 %

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments