Wednesday, September 22, 2021
0 0
Homeশীর্ষ খবরলোকসভা নির্বাচন: ভারতের ‘বাঁচা– মরার’ লড়াই

লোকসভা নির্বাচন: ভারতের ‘বাঁচা– মরার’ লড়াই

Read Time:10 Minute, 21 Second

শশী থারুর, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
ভারত সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, কাজেই এ মহাযজ্ঞের আকারের বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়া কোনভাবেই উচিত নয়, কারণ এটিকে আখ্যায়িত করা হয়ে “মানবিক ব্যবস্থাপনায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঘটনা” হিসেবে। ১১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ২৩ মে শেষ হতে যাওয়া এই নির্বাচনে ৯০০ মিলিয়ন উপযুক্ত ভোটার (যাদের মধ্যে ১৫ মিলিয়ন হলেন প্রথম বারের ভোটার) পাঁচ শতাধিক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্বকারী প্রায় ১০,০০০ প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ করবেন, যারা লোক সভার ৫৪৫টি আসনের জন্য লড়ছেন। ভারতের প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনই পূর্ববর্তী নির্বাচনের রেকর্ড ভঙ্গ করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ইভেন্টের স্বীকৃতি লাভ করে। এখানে আরো উল্লেখ্য যে, পূর্বের ১৬ টি লোকসভা নির্বাচনের কোনটিই এবারের নির্বাচনের মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
নির্বাচন এপ্রিলের ১১ তারিখ থেকে মে মাসের ১৯ তারিখ পর্যন্ত মোট সাত দফায় অনুষ্ঠিত হবে এবং ২৩ মে’র মধ্যে সকল ব্যালট গণনা করা হবে। উত্তর প্রদেশের (এ রাজ্য থেকে লোক সভায় ৮০জন সাংসদ নির্বাচিত হয়ে থাকেন) মতো বড় বড় রাজ্যগুলোর নির্বাচন প্রত্যেক দফায়ই অনুষ্ঠিত হবে, অন্যান্য রাজ্যের নির্বাচন এক দিনেই সমাপ্ত হবে। আমার নিজের সংসদীয় আসন তিরুবন্তপুরম, দক্ষিণাঞ্চলীয় কেরালা রাজ্যের রাজধানী, যেখানে আমি তৃতীয় বারের মতো ভোট প্রার্থনা করছি, সেখানে তৃতীয় দফায় ২৩ এপ্রিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, এ দিনে ১৪ টি রাজ্যের আরো ১১৪টি আসনের নির্বাচন হবে।
এই মহাগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ ভারতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) ১ মিলিয়ন ভোট পোলিং কেন্দ্র এবং ২.৩৩ মিলিয়ন ব্যালট ইউনিট স্থাপন করবে। নির্বাচন কমিশন ১১ মিলিয়ন কর্মী নিয়োগ করবে (যাদের অনেককেই বিভিন্ন সরকারি সংস্থা থেকে ধার নেওয়া হবে), তারা সর্বশেষ ভোটার অবধি পৌছার জন্য বাস-ট্রেন থেকে শুরু করে হাতি কিংবা উট পর্যন্ত যে কোন যোগাযোগ মাধ্যমে সফর করবেন। ইসিআইর নিজস্ব সিদ্ধান্ত, কোন ভোটারকে ভোটেকেন্দ্রে পৌছার জন্য দুই কিলোমিটারের বেশি দূর যেতে হবে না, এটির ফলে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতে পারে। গত নির্বাচনে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের একটি বনে একজন আবাসিক ভোটারের জন্য একটি ভোট কেন্দ্র স্থাপন করতে হয়েছিল। আরেকটি ভোট কেন্দ্র স্থাপন করতে হয়েছিল হিমালয় পাহাড়ে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৪,৫০০ মিটার (১৫,০০০ ফুট) উপরে, যা কিনা পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভোট কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল।
ভারতীয় গণতন্ত্রের এই পঞ্চবার্ষিকী উৎসবের উদ্দীপনা, খরচা ও অন্যান্য সকল পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সত্ত্বেও, ভোটারদের অংশগ্রহণ মূল উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে। ১৯৫২ সালের পর থেকে হিসেব করলে ২০১৪ সালের নির্বাচনসমূহে সবচেয়ে বেশি ভোটার অংশগ্রহণ ছিল, কিন্তু সেটাও ছিল মোট ভোটারের মাত্র ৬৬.৪ শতাংশ। আমি একটি অনানুষ্ঠানিক টুইটার জরিপে এরকম ফলাফলই পেয়েছি, মাত্র ১৫,০০০ হাজার অংশগ্রহণকারীর মধ্যে মাত্র ৬৬% অংশগ্রহণকারী বলেছেন যে আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য তারা নিবন্ধিত হয়েছেন, এবং তারা ভোট দিতেও আগ্রহী।
এ বিষয়টি উদ্বেগজনক। সচেতনভাবে ভোট দান প্রক্রিয়া থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে ভারতের মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশই নিজেদের অজান্তে দেশের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণে নিজেদের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকছেন এবং এ অসংখ্যাটি অনেক বেশি হওয়াতে বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়ারও উপায় নেই।
গত পাঁচ বছরে ভারতে প্রচুর পরিমাণে সরকারের ভূল নীতি ও বায়বীয় বক্তৃতা সামনে এসেছে। আচ্ছে দিন (ভালো দিন) এবং একটি নতুন ভারত সম্পর্কে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সকল বড় বড় কথা সত্ত্বেও, করুণ বাস্তবতা হলো: নয়া দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রশাসন সাধারণ মানুষের সত্যিকারের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সাম্প্রতিক রাজ্য সভার নির্বাচনসমূহের ফলাফলে দেখা যায়, জনগণ বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করছে, তা থেকে এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে যায়।
দেশের বর্তমান অবস্থায় ভোটারদের অসন্তুষ্টিতে বিস্মিত হওয়ার কোন কারণ নেই। দেশ জুড়ে কৃষি দুর্ভোগ বিরাট আকার ধারণ করেছে: রেকর্ড সংখ্যক কৃষক আত্মত্যা করছেন, কৃষকরা দেশজুড়ে তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার কর্তৃক গৃহীত অনুপযুক্ত উদ্যোগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। একই ভাবে, একটি প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে, বেকারত্ব ৪৫ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌছেছে, সে প্রতিবেদন ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সরকার যে আপ্তবাক্য প্রতিনিয়ত জপ করছে, সেটি উল্টো সরকারি জিডিপি বৃদ্ধির পরিসংখ্যানের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস প্রবণতার ইন্ধন জোগাচ্ছে। ২০১৬ সালে মুদ্রারহিতকরণ পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়া এবং এর অদক্ষ বাস্তবায়নের ফলে সৃষ্ট অসুবিধার পর অর্থনীতি এমন এক গোলক ধাঁধায় প্রবেশ করেছে যে কোন ধরনের তথ্য-উপাত্তের ছল-চাতুরিই বিজেপিকেআরেক বারের জন্য সুযোগ করে দেবে না।
সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে এবং ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য সর্বশেষ বাজেটে অনেকগুলো অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার ঘোষণা দিয়েছে এর মধ্যে রয়েছে কৃষকদের জন্য আয় সহায়তা প্রকল্প এবং কর থেকে অব্যহতি প্রাপ্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি ইত্যাদি। কিন্তু জনগণকে আকৃষ্ট করার জন্য এগুলো খুবই অল্প, আর উদ্যোগ নিতে দেরিও হয়ে গেছে প্রচুর।
কাজেই এখন বিজেপি পুলওয়ামাতে সংগঠিত জয়শ-এ-মোহাম্মদের সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলাকে (যে হামলায় ৪০ জন ভারতী আধা সামরিক সৈন্য নিহত হয়েছেন এবং জয়শের মূল ভিত্তিভূমি পাকিস্তানের সাথে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে) পুঁজি করে নিজেকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে কার্যকর রক্ষাকারী হিসেবে উপস্থাপন করতে চাচ্ছে। দায়িত্ব পালনে নিজেদের ব্যর্থতা থেকে ভোটারদের দৃষ্টি সরানোর অসম্ভব প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিজেপি আসন্ন নির্বাচনকে একটি খাকি গণভোটে রূপান্তরিত করার আশা করছে। যাতে দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক দুর্দশা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার প্রতিদিনের ভীতিকে আড়াল করে দেবে সীমান্তের সহিংসতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা।
ভারতীয় ভোটারদেরকে অবশ্যই দুটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এর মাঝে একটি সিদ্ধান্ত অবশ্যই লোক সভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব কে করবেন, সেটা ঠিক করা। কিন্তু ভোটারদেরকে তার চেয়েও মৌলিক যে সিদ্ধান্তটি নিতে হবে, তা হলো: তারা কি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারত চায়, যেটি আশাকে ধারণ করবে, নাকি তার বিভিক্ত ভারত চায়, যেটি ভীতি ছড়াবে?
________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে “A Battle for Indias Soul” শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। লেখক কংগ্রেস নেতা এবং ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ছবি প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংগৃহীত।


Happy

Happy

0 %


Sad

Sad

0 %


Excited

Excited

0 %


Sleepy

Sleepy

0 %


Angry

Angry

0 %


Surprise

Surprise

0 %

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments