Wednesday, September 22, 2021
0 0
Homeশীর্ষ খবরব্রেক্সিট: অসম্ভাব্যতার ত্রিভূজ

ব্রেক্সিট: অসম্ভাব্যতার ত্রিভূজ

Read Time:11 Minute, 32 Second


এমিলি জনস ও ক্যালাম মিলার, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
ইইউ কর্তৃক সর্বশেষ যুক্তরাজ্যের সদস্যপদের মেয়াদ বৃদ্ধির পর থেকে বিশ্ব জুড়ে পর্যবেক্ষকরা বিস্মিত হতে পারেন যে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া এতো প্যাঁচালো বলে প্রমাণিত হচ্ছে কেন? সংক্ষেপে এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, যুক্তরাজ্য সরকার ও সংসদ তাদের তিনিটি অসঙ্গতিপূর্ণ লক্ষ্য পূর্ণ করতে চাচ্ছে, এ তিনটি হলো: দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ও রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের মধ্যে কঠোর সীমান্তে ফিরে না যাওয়া এবং যুক্তরাজ্যের নিজস্ব বাণিজ্য চুক্তি করার সক্ষমতা অর্জন, অর্থাৎ বাণিজ্য নীতির স্বায়ত্তশাসন।
ব্রিটিশরা শেষ পর্যন্ত যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে, তা হলো এক সাথে এই তিনটি লক্ষ্যের মধ্যে বড়জোর দুইটি লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। এর মানে ব্রেক্সিট ইস্যুতে আগাতে হলে তিনটি দৃশ্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
প্রথম দৃশ্যপটটি “ফ্রি ট্রেড ইউনিয়ন” কেন্দ্রিক, এটির মাধ্যমে ব্রিটেন ট্রেড পলিসি এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার নিশ্চয়তা পাচ্ছে, কিন্তু তার বিনিময়ে আয়ারল্যান্ডে কঠোর সীমান্ত মেনে নিতে হবে। ট্রেড পলিসি স্বায়ত্ত শাসনের জন্য যুক্তরাজ্যকে ইইউ কাস্টমস ইউনিয়ন ও একক বাজার উভয়টি ত্যাগ করতে হবে। উভয় ক্ষেত্রে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ও রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের সীমান্তের মধ্যে কাস্টম এবং রেগুলেটরি চেক স্থাপন করতে হবে। যদিও কেউ কেউ পরামর্শ দিচ্ছেন যে, নতুন প্রযুক্তি বাহ্যিক সীমান্তের প্রয়োজনীয়তা থেকে রেহাই দিতে পারে, কিন্তু আদতে এরকম কোন প্রযুক্তি বিদ্যমান নেই। এ পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো কঠোর সীমান্ত পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তি ঝুঁকিতে পড়বে, যে চুক্তির ফলে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের কয়েক দশক ধরে চলে আসা সহিংসতার সমাপ্তি হয়েছিল।
দোসরা দৃশ্যপটে আইরিশ প্রশ্নের সমাধান পাওয়া যায়। যুক্তরাজ্য আয়ারল্যান্ডে কঠোর সীমান্ত ছাড়াই নিজেদের মতো করে তাদের ট্রেড পলিসি নির্ধারণের সুযোগ ভোগ করতে পারে, কিন্তু এজন্য দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে বলি দিতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডকে ইইউ কাস্টমস ইউনিয়ন ও একক বাজারে রাখা যাবে, কিন্তু তার ফলে আইরিশ সাগরে একটা সীমান্ত প্রতিষ্ঠিত হবে, সেটি হবে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড এবং গ্রেট ব্রিটেনের মধ্যে। অর্থাৎ দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বিপন্ন হয়ে পড়বে।
এই ব্যবস্থায় সমস্যা হলো যুক্তরাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন অংশে আলাদা আলাদা ব্যবসায়িক নিয়ম-নীতি চালু হবে। শুধু ইউনিয়নে থেকে যাওয়া নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডই যে যুক্তরাজ্যের বাকি অংশ থেকে আলাদা হয়ে যাবে, তাই নয় নয়া আরো ঝুঁকি বেড়ে যাবে হয়তো স্কটল্যান্ডও ইইউর সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রাখতে চাইবে তখন। আর স্কটল্যান্ড যদি আরেকটি স্বাধীন গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে পুরো যুক্তরাজ্যই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তৃতীয় দৃশ্যপট অনুসারে, যুক্তরাজ্য হয়তো আইরিশ সমস্যা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার সমস্যা এড়িয়ে যেতে পারবে, কিন্তু সেক্ষেত্রে কাস্টমস ইউনিয়ন ও একক বাজার উভয়টিতে থাকতে হবে, এর ফলে যুক্তরাজ্যের “গ্লোবাল ব্রিটেনের” স্বপ্ন ত্যাগ করতে হবে। এ পদ্ধতিতে ট্রেড পলিসিতে কোন অর্থবহ নিজস্ব সক্ষমতা অর্জিত হবে না। হাউজ অব কমনসে উপস্থাপিত “কমন মার্কেট-২” প্রস্তাবনার সারাংশ হচ্ছে এই।
নরওয়ের অনুসরণ করে যুক্তরাজ্যও বেছে বেছে সাধারণ কৃষিনীতি (কমন অ্যাগ্রিকালচারাল পলিসি) ও সাধারণ মৎস্য নীতি (কমন ফিশারিজ পলিসি) থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, এভাবে ইইউর বাজেটে যুক্তরাজ্যের অবদান হ্রাস করা যেতে পারে। কিন্তু এ ব্যবস্থায়ও ইইউ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের যুক্তরাজ্যে অবিভাসী হওয়ার সুযোগ থাকবে, যা কিনা “প্রস্থান” প্রচারণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। একইভাবে, ব্রিটেন ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিসের বিচারের আওতায়ও থেকে যাবে, যদিও সেটা পরোক্ষভাবে হবে।
এছাড়াও আরেকটি বিকল্প আছে, সেটি হলো ইইউর সাথে শুধুমাত্র কাস্টমস ইউনিয়নে থাকা, এ বিকল্পটি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সবচেয়ে কাছাকাছি আছে এখন অবধি। কিন্তু এতেও ব্রেক্সিটের ত্রিমাত্রিক ঝামেলার সমাধান হয় না। এ পদ্ধতি যদি যুক্তরাজ্যকে অভিবাসনের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের অনুমতি দেয়, তাহলে ব্রিটেন ও ইইউর মধ্যে নতুন রেগুলেটরি চেকের দরকার পড়বে। এর মানে ব্রিটেন একক বাজার থেকে আলাদা হয়ে পড়বে, অথচ ইইউতে যুক্তরাজ্যের মোট রফতানির ৪০%ই এই একক বাজারের মাধ্যমে হয়, ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী।
ব্রেক্সিটে অসম্ভাব্যতার এই ত্রিভূজ থেকে স্পষ্ট হয়, কেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র প্রস্তাবিত চুক্তি বারবার হাউজ অব কমন্সে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। প্রস্থান চুক্তি হিসেবে এতে ইইউর সাথে যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যত সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা থাকছে, কিন্তু এর মধ্যে আয়ার‌ল্যান্ডের কঠোর সীমান্তে ফিরে যাওয়া প্রতিরোধের আইনি বাধ্যবাধকতাও অন্তর্ভুক্ত আছে। ব্রেক্সিটের ত্রিমাত্রিক এ ঝামেলার মধ্যে মে’র প্রস্তাবিত চুক্তিতে “ফ্রি ট্রেড ইউনিয়ন” তথা প্রথম দৃশ্যপটকে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ট্রেড পলিসি অটনমি ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার মধ্যে কোনটি বেছে নেওয়া হবে, সেটি ব্রেক্সিট আলোচনার পরবর্তী ধাপের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। এই অস্পষ্টতার কারণেই অনেক সাংসদ চিন্তায় পড়ে গেছেন।
কট্টর ব্রেক্সিটপন্থীরা ট্রেড পলিসিতে স্বায়ত্তশাসন (অটনমি) নিশ্চিত করার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, এর মানে তারা আইরিশ সাগরে একটি সীমান্ত মেনে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু এরকম হলে তারপরই স্কটল্যান্ড ইইউর সাথে তাদের নিজস্ব বন্দোবস্ত করতে চাইবে, যা কিনা যুক্তরাজ্যকে বড় ধরনের সাংবিধানিক সমস্যা, এমনকি সম্ভবত রাজ্যগুলোর মধ্যে বিচ্ছেদের দিকে ঠেলে দেবে।  এ পরিস্থিতি এড়াতে হলে গুড ফ্রাইডে অ্যাগ্রিমেন্ট এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে যুক্তরাজ্যকে ট্রেড পলিসিতে নিজেদের স্বাধিকারের বিষয়টিকে বলি দিতে হবে। কিন্তু এটি কট্টর ব্রেক্সিটপন্থীদের অপছন্দের কারণ হবে, এবং সম্ভবত কনজারভেটিভ পার্টিতে বিভক্তি দেখা দেবে, কিন্তু থেরেসা মে এই ঝুঁকি নিতে চান না।
ব্রিটিশ নেতাদের স্বীকার করতে হবে যে ব্রেক্সিটের এ সকল পরিস্থিতির মধ্যে যে কোন একটিই বেছে নিতে হবে, এবং এ জন্য ভোটারদের অগ্রাধিকার চিহ্নিত করার সুবিধার্থে জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় বিতর্কের আয়োজন করা দরকার। এক্ষেত্রে হয়তো উপরের তিনটি পরিস্থিতির যে কোন একটিকে গ্রহণ করতে হবে, অথবা পুরো ব্রেক্সিট প্রক্রিয়াকেই স্থগিত করার পথ বেছে নিতে হবে। একটি পরিপক্ক ও খোলামেলা আলোচনা না হলে যুক্তরাজ্যকে অন্তহীন অনিশ্চয়তা আর সিদ্ধান্তহীনতার ক্ষয়-ক্ষতি বহন করে যেতে হবে।
কিন্তু অবশ্যই একটি যথাযথ বিতর্কের জন্য দরকার কার্যকর নেতৃত্ব, যে কিনা বিকল্পসমূহের উপর গুরুত্বারোপ করবে এবং ছাড় দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করবে। যদি কখনো ব্রেক্সিটের ক্ষত নিরাময় করতে হয়, তবে অবশ্যই ভোটারদেরকে দলীয় রাজনীতিতে সেসকল নেতাকে বরণ করে নিতে হবে যারা অপর পক্ষের নিকট পৌছতে পারেন এবং নীতিনির্ধারণী বিষয়সমূহে সততার সাথে কথা বলতে পারেন। কেবলমাত্র সবাই মিলে এক সাথে কাজ করলেই যুক্তরাজ্যে সর্বজনগ্রাহ্য সমাধানে পৌছা সম্ভব হবে।
________________________________
নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে “The Brexit Impossibility Triangle” শিরোনামে প্রকাশিত। লেখক এমিলি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লাভাটনিক স্কুল অব গভর্নমেন্টের পাবলিক পলিসি বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক। আর মিলার একই স্কুলের অ্যাসোসিয়েট ডিন ও চিফ অপারেটিং অফিসার। ছবি: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংগৃহীত।

Happy

Happy

0 %


Sad

Sad

0 %


Excited

Excited

0 %


Sleepy

Sleepy

0 %


Angry

Angry

0 %


Surprise

Surprise

0 %

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments