Sunday, December 5, 2021
0 0
Homeশীর্ষ খবরনিউ জিল্যান্ড হামলা: রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের দায়...

নিউ জিল্যান্ড হামলা: রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের দায়…

Read Time:12 Minute, 15 Second

মেহদি হাসান, দ্য ইন্টারসেপ্ট:
নিউ জিল্যান্ড হামলা, যে হামলায় দুটো মসজিদে অন্তত ৪৯ জন নিহত হয়েছেন, সেটির অভিযুক্ত লোকটির অনলাইন ইশতেহারে আছে
 “এমনকি যদি আগামীকালই সকল অইউরোপীয়দেরকে আমাদের ভূমি থেকে বের করে দেই, তবু ইউরোপীয়রা ধ্বংস এবং চুড়ান্ত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে থাকবে,” ইশতেহার আরো এগুতে থাকে। “শেষ পর্যন্ত, অবশ্যই আমরা আমাদের ‍উর্বরতার হারকে (প্রজননের) পুনঃস্থাপিত করতে হবে, নয়তো এটিই আমাদেরকে মেরে ফেলবে।”
ঘাতক তার হামলাকে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ হিসেবে উল্লেখপূর্বক ইসলামের প্রতি তার অপছন্দ এবং বিশেষ করে ইসলামি বিশ্বাস গ্রহণের প্রতি তার ঘৃণার কথা উল্লেখ করেছে। সে “শ্বেত গণহত্যার” কথা বলে এবং মুসলমানদেরকে “পাশ্চাত্যে আক্রমণকারী সবচেয়ে ঘৃণ্য গোষ্ঠী” হিসেবে আখ্যায়িত করে।
বেলিংকার্টের রবার্ট ইভান্সের যুক্তি অনুসারে এই ইশতেহারটি একটা ফাঁদ হোক আর যাই হোক, এটির উদ্দেশ্য ট্রল করা, উত্তেজিত করে তোলা, এবং “শিটপোস্টিং” করা হোক কিংবা না হোক, এ কথা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই যে এটি অবশ্যই একটি ঘৃণায় ভরপুর বার্তা। এটি জঘন্য, চরম আকারে মুসলিম বিদ্বেষী ও অভিবাসী বিদ্বেষী এবং বিকৃতমনস্কতার পরিচায়ক।
কিন্তু এর কোনটাই আকস্মিক ধাক্কা দেওয়ার মতো কিছু নয়। কীভাবে আকস্মিক ধাক্কা লাগার মতো হতে পারে? আপনি কি খেয়াল করছেন না? বেশির ভাগ বাগাড়ম্বর এবং প্রসঙ্গ সরাসরি মূলধারার রাজনীতি ও গণমাধ্যম থেকেই ধার নেওয়া, বিশেষত­­ যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনের কথা বলা যায়।
আমি যখন ইশতেহারটি পড়ছিলাম, তখন উচ্চপর্যায়ের মার্কিন রাজনীতিবিদদের কথা চিন্তা করছিলাম, উদাহরণস্বরূপ মার্কিন রাষ্ট্রপতির কথা বলা যেতে পারে, যিনি বলেছিলেন, “ইসলাম আমাদের ঘৃণা করে,”  মসজিদ থেকে আসা মানুষদের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন “এরা চোখে ঘৃণা আর মনে মৃত্যু নিয়ে বেরিয়ে আসে,” এবং অভিবাসীদের আগমণকে “আগ্রাসনের” সাথে তুলনা করেছিলেন। কিংবা সিনেটর টেড ক্রুজের কথা বলা যেতে পারে, যিনি “মুসলিম প্রতিবেশীরা চরমপন্থী হয়ে ওঠার আগেই তাদেরকে পাহারা দিতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে” আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথবা সিনেটর মার্কে রুবিও যিনি বলছিলেন, “যে কোন স্থান, সেটা ক্যাফে হোক, রেস্তোরা হোক কিংবা ইন্টারনেট সাইট হোক, সেখান থেকে চরমপন্থী হয়ে থাকলে” তিনি সে জায়গাটি বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে। অথবা সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম, যিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন: “যদি আমাকে একটি মসজিদের উপর নজরদারি করতে হয়, আমি সেটা করবো।” অথবা  সাবেক গভর্নর মাইক হুকাবি, যিনি শুক্রবারে মধ্যপ্রাচ্যর মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসার মুসলমানদেরকে “খাচা থেকে বের হওয়া পশু” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অথবা এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন সাহেবের কথা বলা যায়, যিনি কিনা ২০১৬ সালের ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে প্রস্তাব করেছিলেন মুসলিম-আমেরিকান নাগরিকত্ব ভালো ব্যবহার ও আনুগত্যের প্রমাণ পেশ করা শর্তসাপেক্ষ হতে হবে, তার ভাষায়: “যদি তুমি একজন মুসলমান হয়ে থাকো, এবং তুমি আমেরিকাকে ভালোবাস, স্বাধীনতাকে ভালোবাস, সন্ত্রাসকে ঘৃণা কর, তাহলে এখানে অবস্থান করো এবং বিজয়ী হতে আমাদেরকে সাহায্য করো, এবং একসাথে ভবিষ্যৎকে বিনির্মাণ করো।”
যখন আমি অভিযুক্ত ঘাতকের ইশতেহার পড়ছিলাম, আমার মনে পড়ছিলো ডানপন্থী পণ্ডিতরা একই রকম কত বিবৃতি দিয়েছেন এবং সে জন্যে কোন শাস্তির মুখোমুখি হন নি। উদাহরনস্বরূপ, লেখক আন কোল্টার প্রকাশ্যে “পাগড়িধারী” “উষ্ট্রারোহ” ও “জিহাদী বানর” সম্পর্কে কথা বলেছেন, ৯/১১’র তিন দিন পর ঘোষণা দিয়েছিলেন, “আমাদের উচিত তাদের দেশসমূহে আগ্রাসন চালানো, তাদের নেতাদের হত্যা করা, এবং তাদেরকে খৃষ্টান বানানো।” কিংবা ভাষ্যকার বেন শেপিরো, যিনি বিশ্বাস করেন যে, বিশ্বের “সংখ্যাগরিষ্ঠ” মুসলিম জনগোষ্ঠী “চরমপন্থী” এবং দাবি করেন যে “আরবরা বোমা বানাতে আর ময়লার মধ্যে বসবাস করতে পছন্দ করে।” কিংবা ফক্স নিউজের হোস্ট টুকার কার্লসন, যিনি শ্বেত গণহত্যা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বারবার অযৌক্তিকভাবে আউড়িয়ে নব্য নাৎসীদের সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন, এবং ইরাকিদেরকে “প্রায় নিরক্ষর আদিম বানর” বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিংবা প্রেসিডেন্টের বন্ধু ব্রিগিট গাব্রিয়েল, যিনি মনে করেন যে: “একজন প্র্যাক্টিসিং মুসলিম যে বিশ্বাস করে যে কুরআন আল্লাহর বাণী, যে ইসলামের আনুগত্য করে, এবং প্রতি শুক্রবারে মসজিদে গিয়ে প্রার্থনা করে সে কখনোই মার্কিন ‍যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত নাগরিক হতে পারে না।” কিংবা ব্রেইটবার্ট নিউজের সাবেক এক্সিকিউটিভ চেয়ার ও প্রেসিডেন্টের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ বেনন, যিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, “ইসলাম শান্তির ধর্ম নয়,” বরং “আনুগত্যের ধর্ম” এবং হুশিয়ারি জারি করেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র “ইসলামিক স্টেট অব আমেরিকায়” রূপান্তরিত হতে পারে।
আমি যখন ইশতেহারটি পড়ছিলাম, তখন সেসকল খ্যাতনামা মুক্তমনাদের নাম স্মরণ না করে পারছিলাম না, উদাহরণস্বরূপ নাস্তিক বিজ্ঞানী স্যাম হ্যাসির, যিনি ইসলামকে “খারাপ ধারণাসমূহের মা” খেতাব দিয়েছিলেন, এবং ঘোষণা করেছিলেন যে “আমরা ‘সন্ত্রাসবাদের’ সাথে যুদ্ধ করছি না, আমরা ইসলামের সাথে যুদ্ধ করছি।” কিংবা টিভি হোস্ট বিল মাহের যিনি ইসলামকে “এক মাফিয়া” বলে আখ্যায়িত করেন এবং “সহিংস” মুসলমানদেরকে অভিযুক্ত করেন যে তারা “সেই মরুভূমির জিনিসকে আমাদের বিশ্বে” নিয়ে আসছে। কিংবা লেখক এবং প্রাক্তন মুসলিম আয়ান হিরসি আলি, যিনি দাবি করেন যে ইসলাম “চূর্ণ” হয়ে যাবে এবং মনে করেন ডে “প্রত্যেক নিবেদিতপ্রাণ মুসলিম, যারা সত্যিকারের ইসলাম চর্চা করতে আগ্রহী, তারা যদি সরাসরি ৯/১১ হামলাকে সমর্থন নাও করেন, অন্ততপক্ষে তারা অবশ্যই এদেরকে সমর্থন করেন।” কিংবা ঔপন্যাসিক মার্টিন অ্যামিস, যিনি একদা বলেছিলেন, “এরকমটি বলার সুনির্দিষ্ট কারণ আছে যে, মুসলিম সম্প্রদায়কে অবশ্যই নিজেদের বাড়ি খোঁজে পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ভোগতে হবে। আপনার কি তা মনে হয় না? কোন ধরনের ভোগান্তি? তাদেরকে ভ্রমণ করতে না দেওয়া। নির্বাসনে পাঠানো। স্বাধীনতা হ্রাস করা। যে সকল মানুষকে দেখে মনে হয় যে তারা মধ্যপ্রাচ্য অথবা পাকিস্তান থেকে এসেছে তাদেরকে তল্লাশী করা।”
একটা বিষয় স্পষ্ট করা দরকার, আমি বলছিনা যে এ ধরনের লোকজন, সে রক্ষণশীল হোক বা উদারপন্থী, রাজনীতিবিদ কিংবা পণ্ডিতই হোক, তারা এ ধরনের জঘন্য অপরাধের জন্য প্রতক্ষরূপে দায়ী। (যদিও অভিযুক্ত হামলাকারী ডোনাল্ড ট্রাম্পের “শ্বেত স্বকীয়তার প্রতীক” হিসেবে প্রশংসা করেছে, এবং দাবি করেছে যে “সব কিছুর উপর যে ব্যক্তিটি আমাকে প্রভাবিত করেছেন তিনি হলেন ক্যান্ডেস ওয়েন্স, একজন “সদা ডানপন্থী” সামাজিক মাধ্যম সুপারস্টার। আবারো, এটি ইচ্ছাকৃত উত্তেজনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হতেও পারে, নাও হতে পারে।)
রক্ষণশীলরা নিজেদের উপদেশ গ্রহণ করার জন্য অনেক দেরি হয়ে কি যায় নি?
এবং আমরা বাকিদের কী অবস্থা? সর্বশেষ নিউ জিল্যান্ডে সংগঠিত ঘৃণ্য নৃশংসতা থেকে আমরা কি শিক্ষা নেব? মসজিদে যখন মুসলিমদের উপর কোন নৃশংস হামলা হবে না, তখনও কি আমরা ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ইচ্ছুক এবং সক্ষম? ক্যাবল নিউজ, কিংবা সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনে যখন আমরা মুসলিম বিদ্বেষী বাগাড়ম্বর দেখতে পাই, তখন আমরা সেটাকে জঘন্য হিসেবে আখ্যায়িত করবো তো? নাকি শুধু কোন গণহত্যাকারীর অনলাইন ইশতেহারে এসব কথা দেখলেই কেবল প্রতিবাদ করবো?
আমার সন্দেহ আছে এই বিষয়ে। শুক্রবারে ক্যাম্ব্রিজের অ্যাকাডেমিক প্রিয়ংবদা গোপাল টুইটারে যে পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন “মানুষ শুধুমাত্র তখনই বর্ণবাদ এবং ইসলামোফোবিয়ার নিন্দা করতে পারে ভীত এবং শঙ্কিত হয়ে যখন এই সমস্যার অংশ হিসেবে প্রচুর রক্ত ঝরে। কারণ অন্য সব সময় তারা এগুলোকে স্বাভাবিকীকরণ ও লঘুকরণে ব্যস্ত থাকে।”
________________________________

আল জাজিরার জনপ্রিয় সাংবাদিক মেহদি হাসান নিবন্ধটির লেখক। তিনি নিয়মিত দ্য ইন্টারসেপ্টে কলাম লিখেন। এটিও সেখানেই লিখেছেন। মূল নিবন্ধের শিরোনাম- “Dont Just Condemn the New Zealand Attacks Politicians and Pundits Must Stop Their Anti-Muslim Rhetoric” (শুধু নিউ জিল্যান্ড হামলার নিন্দা জানিও না    রাজনীতিবিদ ও পণ্ডিতগণকে অবশ্যই মুসলিম বিদ্বেষী বাগাড়ম্বর বন্ধ করতে হবে।)


Happy

Happy

0 %


Sad

Sad

0 %


Excited

Excited

0 %


Sleepy

Sleepy

0 %


Angry

Angry

0 %


Surprise

Surprise

0 %

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments