0 0 lang="en-US"> নয়া চীন-মার্কিন ঠাণ্ডা যুদ্ধের উচ্চব্যয় - ভাষান্তর
ভাষান্তর

নয়া চীন-মার্কিন ঠাণ্ডা যুদ্ধের উচ্চব্যয়

Read Time:11 Minute, 30 Second

মিনজিন পেই, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাটিকে নয়া ঠাণ্ডা যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করাটা সুবিধাজনক। এখনো এই ঠাণ্ডা যুদ্ধের বাস্তবতা যদিও পুরোপুরি বোধগম্য নয়, তবে সুস্পষ্ট একটি বিষয়কে অস্পষ্ট রাখার কোন মানে নেই, তা হলো এই ঠাণ্ডা যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের ঠাণ্ডা যুদ্ধ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বিংশ শতাব্দির ঠাণ্ডা যুদ্ধ দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক জোটের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থা তৈরি করেছিল। তার বিপরীতে মার্কিন-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমন দুটি অর্থনীতি মুখোমুখি হয়েছে, যে দুটি অর্থনীতি একে অপরের সাথে খুব ঘনিষ্টভাবে জড়িত, আবার বাকি বিশ্বের সাথেও উভয় অর্থনীতিরই রয়েছে ঘনিষ্ট সম্পর্ক। এজন্য বর্তমান ঠাণ্ডা যুদ্ধের চুড়ান্ত লড়াইটা দক্ষিণ চীন সাগর বা তাইওয়ানে না হয়ে বরং অর্থনৈতিক (বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ প্রভৃতি) ক্ষেত্রেই হবে।

কয়েকজন মার্কিন কৌশলগত চিন্তাবিদ স্বীকার করে নিয়েছেন, এবং এখন যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ঠাণ্ডা যুদ্ধে জিততে চায়, তবে অবশ্যই চীনের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করতে হবে, এবং অন্যান্য মিত্রদেরকেও এমনটি করার জন্য চাপ দিতে হবে। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক যুদ্ধ যেভাবে চলছে, তাতে এটা করার তুলনায় বলা অনেক সহজ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উক্তি “জয় করা সহজ”-এর বিপরীতে এ যুদ্ধে ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পাচ্ছে, কাজেই উত্তেজনা বৃদ্ধির আগে ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার চিন্তা করা দরকার।

যদি যুক্তরাষ্ট্র তার ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কারণে অর্থনৈতিক বিচ্ছেদের খরচা বহন করার জন্য লড়াই করেও, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ মিত্রই এরকম করতে চাইবে না। তার কারণ তারা চীনের তরফ থেকে এই মুহূর্তে কোন ধরনের নিরাপত্তা হুমকি অনুভব করছে না। চায়না টেলিকম জায়ান্ট হুওয়াওয়ের বিরুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসী অবস্থানের বিষয়ে মিত্রদের সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে নীরবতার বিষয়টি তো স্পষ্টই।

এখন পর্যন্ত চীন বিরোধী ক্যাম্পেইনের আওতায় কানাডাতে হুওয়াওয়ের সিইও মেং ওয়ানজাহু কারাবন্দী হয়েছেন এবং কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা ও মার্কিন প্রযুক্তি চুরির অভিযোগে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন তার মিত্রদের আরো আহ্বান জানিয়েছেন যাতে হুওয়াওয়েকে ওয়্যারলেস মিত্রদেশগুলোর ওয়্যারলেস কম্যুনিকেশন নেটওয়ার্কের বাইরে রাখা হয়। অথচ এই হুওয়াওয়েই পরবর্তী প্রজন্মের ৫জি মোবাইল টেকনলোজির বৈশ্বিক নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠান।

পশ্চিমা দেশগুলোতে ৫জি নেটওয়ার্ক প্রস্তুতের দায়িত্ব হুওয়াওয়ের উপর ন্যস্ত করার বিরোধিতার বিষয়টি বেশ শক্তিশালী। চীনা কোম্পানিগুলোর উপর চীনের অবাধ ক্ষমতা রয়েছে। হুওয়াওয়ের ৫জি প্রযুক্তিও এর বাইরে নয়। ফলে এক্ষেত্রে মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রশ্ন রয়েছে। যেসকল দেশ ৫জি প্রযুক্তির ব্যয়বহুল সরঞ্জামাদি ক্রয় করার সামর্থ রাখে না (এবং চীনা আধিপত্য নিয়ে তাদের খুব একটা উদ্বেগ নেই), তারা হয়তো এ ঝুঁকি নিতেই পারে। কিন্তু আমেরিকার ধনী মিত্রদের ক্ষেত্রে বিষয়টি এরকম নয়।

এখন অবধি অস্ট্রেলিয়া আর নিউ জিল্যান্ডই কেবল হুওয়াওয়েকে নিষিদ্ধ করার মার্কিন দাবির প্রতি সম্মতি জানিয়েছে। যেখানে কিনা কানাডা তাদের সাথে যোগ দেওয়ার বিষয়টি চিন্তা করছে, ইউরোপীয় দেশসমূহ ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে স্পর্ধা দেখাচ্ছে, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তারা হয়তো হুওয়াওয়েকে তাদের ৫জি নেটওয়ার্ক নির্মাণের কাজে অংশ গ্রহণের সুযোগ দিতে পারে। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতও হুওয়াওয়েকে বের করে দেওয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মানতে চাচ্ছে না।

নিরাপত্তাজনিত জটিলতা সত্ত্বেও হুওয়াওয়েকে নিষিদ্ধ করলে ৫জি প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধি ও উল্লেখযোগ্য বিলম্ব হতে পারে। এখনো যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদেরকে দোদুল্যমান মিত্রদেরকে এই বিলম্ব বা ব্যয়বৃদ্ধির জন্য কোন ক্ষতিপূরণ কিংবা পুরস্কার দেওয়ার আশ্বাস দেয় নি।

নয়া ঠাণ্ডা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে যেসকল বিষয় মোকাবেলা করতে হবে, এগুলো তার মধ্যে অন্যতমযদিওএখনো আমেরিকাই এখনওউপরের দিকে চলেআসার সুযোগ বেশি, কিন্ত বিজয়ী হওয়াটা খুব সস্তা হবে নাএই লড়াইয়ে ভালোঅবস্থায় থাকতে হলেচায়নাকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা খুবইপ্রয়োজনীয়কিন্তু এরজন্য যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু নিজের ব্যয়টাই যে বহন করতে হবে, বিষয়টা কিন্তু তা নয়। বরং তার মিত্রদের ব্যয়বৃদ্ধির ক্ষতিপূরণও দিতে হবে তাকেই। আর না হলে মিত্ররা তার কথা শুনবে কেন?

বিজয় যে খুব দ্রুত চলে আসবে, তা কিন্তু নয়। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের বিরুদ্ধে স্বল্পকালী সাফল্য অর্জনের জেদ ধরে রাখে, তাহলে তো নয়ই। স্বল্পকালীন সাফল্য অর্জনের প্রচেষ্টার উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বিশাল পরিমাণের সয়াবিন ও নানা এনার্জি পণ্য ক্রয় করতে চাপ প্রয়োগ করে চীনের অঙ্গীকার আদায়। এসব পদক্ষেপ পদ্ধতিগত পরিবর্তনে বাধার সৃষ্টি করবে, যে ধরনের পরিবর্তন হলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেরকে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে সহযোগিতা করতে পারতো। এরকম সুবিধাবাদিতা চীনকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছার বিষয়ে মিত্রদেরকে সন্দেহে ফেলে দেবে, তাদের মনে এই ভয় ঢুকে পড়তে পারে যে তারা কোন ফায়দা ছাড়া অযথাই স্বল্পকালীন উচ্চব্যয়ের বোঁঝা নিজেদের কাঁধে চাপাচ্ছে।

এর মাঝে ট্রাম্প প্রশাসন আবার তার মিত্রদের অর্থনৈতিক স্বার্থের ব্যাপারে কম গুরুত্ব দিচ্ছে, যা কথা-বার্তায় স্পষ্ট হয়ে পড়ছে। স্টিল এবং অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে যে শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন, এর ফলে প্রধানত মার্কিন মিত্ররাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এখন আরো বেশি করার ভয় দেখাচ্ছে, ইউরোপীয় ও জাপানি অটোমোবাইলের উপরও শুল্ক বৃদ্ধির কথা বলছে। ট্রাম্প তার মিত্রদের নিকট থেকে দাবি করতে চাচ্ছেন যে মিত্রদেশে স্থাপিত মার্কিন সামরিক ঘাটির জন্য সেসকল দেশকে পূর্ণ খরচ এবং তার সাতে আরো ৫০% খরচ প্রদান করতে হবে।

ট্রাম্পের ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে শুধু মিত্রদের প্রতি বিশ্বস্থতারই অভাব নয়, বরং তার টেকসই পরিকল্পনারও অভাব রয়েছে, আমেরিকার নিজস্ব অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির কথা বাদই দিন। স্মর্তব্য যে, ট্রাম্প সাহেব হোয়াইট হাউসে প্রবেশের সাথে সাথেই ট্রান্স-প্যাসিফিক অংশীদারিত্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন। এটি একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি, যেটি বিশেষত এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনা অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে গঠিত।

চীনের বিরুদ্ধে নয়া ঠাণ্ডা যুদ্ধ কোন আদর্শ, এমনকি কোন যুদ্ধাস্ত্র দিয়েও জয় করা যাবে না, বরং েএর জন্য অর্থনৈতিক বিস্তার প্রয়োজন, যা ভূরাজনৈতিক লড়াইর কাজ দেবে। আর এখানে শুধুমাত্র আমেরিকার ইচ্ছা অনুসারে কাউকে অস্ত্রসজ্জিত করাটাও যুদ্ধ জয়ের কৌশল হবে না। এ চিন্তা থেকে, যুক্তরাষ্ট্র নিজের মিত্রদের উপর নানা ধরনের বোঝা আরোপ করে নিজেকে কার্যকররূপে নিরস্ত্রীকরণ করছে।

________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে “The High Costs of the New Cold War” শিরোনামে প্রকাশিত। ভাষান্তর কর্তৃক অনূদিত, ছবি প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংগৃহীত। লেখক ক্ল্যারমন্ট ম্যাককেনা কলেজের অধ্যাপক, এবং মার্কিন-চীন সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ।

Happy
0 0 %
Sad
0 0 %
Excited
0 0 %
Sleepy
0 0 %
Angry
0 0 %
Surprise
0 0 %
Exit mobile version