Wednesday, June 16, 2021
0 0
Homeমধ্যপ্রাচ্যসুলতান আবদুল হামিদ কি আহমদ উরাবির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন?

সুলতান আবদুল হামিদ কি আহমদ উরাবির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন?

Read Time:9 Minute, 51 Second


ড. হুসাইন দাকিল, আল জাজিরা ব্লগ:
সর্বশেষ অটোম্যান (ওসমানী) সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের মৃত্যুবার্ষিকী সামনে এসেছে। সুলতান যখন ১৯১৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রোগ শয্যায় বসে ছিলেন, স্ত্রী-সন্তানদের সাথে কফি পান করেছিলেন, জীবনের শেষ মুহূর্তে বিদায় নিতে নিতে তাদেরকে তিনি বলছিলেন, আল্লাহ স্বাক্ষী, আমি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন আর আমার দেশ ও জাতির কল্যাণের উদ্দেশ্য ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিনি, কোন কাজে এগিয়ে যাই নি। সুলতানা তখন তার প্রশংসা করে বলেন, আমরা আপনার ধর্ম, দেশ ও জাতির প্রতি আপনার ভালোবাসার সাক্ষ্য দিচ্ছি। এরপর তাঁর হাত থেকে কফির কাপ পড়ে যায়, তাঁর আত্মা পরপারে পাড়ি জমায়। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ১৮৪২ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর ইস্তাম্বুলের “জুরাগান প্রাসাদে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সুলতান আবদুল মাজিদ, মা তিরমিজকান কাদিন। সুলতানের মা ৩৩ বছর বয়সে মারা যান, যখন তার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। তিনি তার সৎ মা পেরেস্তু কাদিনের নিকট লালিত-পালিত হত। সারা জীবন তিনি তাঁর সৎমায়ের কথা মনে রেখেছেন, এবং ৩৪ বছর বয়সে তিনি ক্ষমতায় আরোহণ করার পর তাকে “সুলতানা মা” উপাধিতে ভূষিত করেছেন। তিনি যখন ১৮৭৬ সালের ৩১ আগস্ট ক্ষমতা লাভ করেন, তখন সাম্রাজ্য ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ অবস্থা পার করছিলো।
সাম্রাজ্যকে এই দুরবস্থা থেকে বাঁচানোর জন্য সব কিছু করা সত্ত্বেও তিনি অনেক অপবাদ এবং ইতিহাস বিকৃতির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো তিনি আরব বিপ্লব এবং এই বিপ্লবের নেতাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, এবং ইংরেজদেরকে মিসরে প্রবেশ ও মিসর দখল করার অনুমতি দিয়েছেন।  আসল ঘটনা হলো, বলা হয়ে থাকে ১৮৮২ সালে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ একটি ফরমান জারি করেন, যাতে আহমদ উরাবি একজন অবাধ্য এবং তিনি আনুগত্য থেকে বের হয়ে গেছেন বলে গণ্য করা হয়েছে। ফলে অনেক মানুষ মনে করে যে এই ফরমানে ইংরেজদের মিসর দখলকে সমর্থন করা হয়েছে। একই সাথে আরেক দল মানুষ মনে করেন এই ফরমান জারি করা হয়েছিলো মিসরের কল্যাণার্থে। কাজেই, আসল ঘটনা কী?
প্রকৃত সত্য হলো এই যে, মুহাম্মাদ আলি ক্ষমতায় আসার পর থেকে মিসর অটোম্যান (ওসমানি) সাম্রাজ্য থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলো। তার পরবর্তীদের সময়ে এই বিচ্ছেদ আরো পাকাপোক্ত হয়, যারা কিনা মিসরে বিদেশী মুদ্রার অনুপ্রবেশের অনুমতি দিয়েছিলেন। আর এই সময়টাতে অটোম্যান সাম্রাজ্য ছিল সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায়। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো তখন জোটবদ্ধ হচ্ছিলো অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে, ভাগ-বাটোরা করে নেওয়ার চেষ্টাও করছিলো। কিন্তু সুলতান আবদুল হামিদের আমলের আরম্ভ হওয়ার সাথে সাথে মিসরে দখলদারির বিরুদ্ধে জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্থান হয়। এই আন্দোলন ইসমাইল পাশাকে সরকার পরিবর্তন, সংসদ নির্বাচন ও ১৮৭৯ সালের সংবিধান প্রকাশ প্রভৃতি দাবি মেনে নিতে বাধ্য করতে সক্ষম হয়। ফলে আবদুল হামিদ এই আন্দোলন থেকে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন, এবং সমর্থন প্রদান করেন। তারাও আবদুল হামিদের সমর্থন থেকে সুবিধা নেয়, এবং এ সমর্থনকে তাদের আন্দোলনের বৈধতার প্রমাণ বলে মনে করে।
তাওফিক পাশার আমলে যখন আন্দোলন আরো তুঙ্গে ওঠে, সুলতান আবদুল হামিদ তখন মিসরি আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য অটোম্যান প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন। মিসরি প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন, মাহমুদ সামি আল-বারুদি, শাইখুল আযহার (আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান) শাইখ মুহাম্মদ আল-ইনবাই, নকিব আল-আশরাফ প্রমুখ। ইউরোপীয়রা সুলতানের এই ভূমিকাকে ভালোভাবে নেয়নি। ফ্রান্স ও ব্রিটেন আলেক্সান্দ্রিয়ার অভিমুখে দুটো যুদ্ধ জাহাজ প্রেরণ করে, এবং অটোম্যান প্রতিনিধি দল মিসর ত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত তারা আলেক্সান্দ্রিয়া ত্যাগ করতে অস্বীকার করে। এদিকে বারুদির নেতৃত্বে বিপ্লব একেবারে নিকটবর্তী হয়ে পড়ে, বিপ্লবের প্রতি অটোম্যান সুলতানের সমর্থন-সহায়তাও বাড়তে থাকে, সুলতান বারুদি এবং তৎকালীন যুদ্ধমন্ত্রী উরাবিকে পাশা উপাধি প্রদান করেন। ফলে বিপ্লব থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের জন্য ইউরোপীয়দের পক্ষ থেকে সুলতানের উপর চাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু সুলতান এই চাপের মুখে নতি স্বীকার করেন নি, বরং সহায়তা আরো বাড়াতে থাকেন।  এমনকি তারফিক পাশাকে অপসারণ করার জন্যও উরাবি তাকে উৎসাহ প্রদান করেন। তাদের মধ্যকার একটি চিঠিতে এরকম লেখা ছিল: মিসরে কে ক্ষমতায় আছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো মিসরের গভর্নরের চিন্তা-চরিত, উদ্দেশ্য ও গতিবিধি কপটতা মুক্ত হওয়া, যাতে করে তার কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হয় মিসরের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা ও খেলাফতের (অটোমান) সাথে সুদৃঢ় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা।
যাই হোক, সুলতানের নামে উরাবির “অবাধ্যতা” বিষয়ক যে ফরমানটি জারি হয়েছিলো ব্রিটেন কর্তৃক মিসর দখলের ছয় দিন পূর্বে, উরাবি নিজেও সুলতানের নিজের ইচ্ছায় সেটি জারি হয়েছে বলে মনে করেন নি। এমনকি তিনি বলেছিলেন, আমরা যা করেছি, তাতে সুলতানের কখনোই অসম্মতি ছিলো না। সেই সমোঝতার (যেটি অটোম্যান প্রতিনিধি দলের সাথে হয়েছিলো) সময়ও কোন অসম্মতি ছিলো না, এমনকি এখন অবধিও নেই। বরং সুলতান কথায় ও কাজে আমাদের কর্মতৎপরতাকে সমর্থন করেছেন। বলা হয়ে থাকে, সুলতানের ইচ্ছা ব্যাতিরেখে এই ফরমান জারি করার জন্য উরাবি তৎকালীন অটোম্যান প্রধানমন্ত্রী আস সদর আল আজমকে অভিযুক্ত করেন। অন্য আরেক দলের মনে করেন, ফরমানটি আসলেই সুলতারের সিদ্ধান্তেই জারি হয়েছিলো, আর সেটা তিনি জারি করেছিলেন বাধ্য হয়ে, যখন তেল আল কবিরের যুদ্ধে উরাবির বাহিনীর উপর ব্রিটিশ বাহিনীর বিজয় নিকটবর্তী হওয়ার বিষয়টি সুলতান উপলব্ধি করতে পারেন, তখন। তিনি তুলনামুলক কম ক্ষতিকর পরিস্থিতি মেনে নিতে চেয়েছিলেন, যাতে মিসর অটোম্যানদের পুরোপুরি হাতছাড়া হয়ে ব্রিটিশদের একচ্ছত্র শিকারে পরিণত না হয়। সম্ভবত এই মতটি বাস্তবতার সবচেয়ে নিকটবর্তী। এ বিষয়ে উরাবি বলেছিলেন, সম্ভবত এই ফরমানটি পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রকাশ করা হয়েছে।
________________________________
ড. হুসাইন দাকিল প্রাচীন নিদর্শন বিশেষজ্ঞ। তিনি গ্রিক ও রোমান প্রাচীন নিদর্শনের উপর আলেক্সান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। মিসরের বিপ্লবের সাথে সর্বশেষ অটোম্যান সুলতান আবদুল হামিদের সম্পর্ক এবং এ নিয়ে প্রচলিত বিভ্রান্তি সম্পর্কে في ذكرى وفاته.. هل خان السلطان عبد الحميد أحمد عرابي؟!” শীর্ষক তাঁর লেখা নিবন্ধটি আল জাজিরা আরবি ব্লগে প্রকাশিত হয়। ছবি http://www.toraseyat.com থেকে সংগৃহীত।


Happy

Happy

0 %


Sad

Sad

0 %


Excited

Excited

0 %


Sleepy

Sleepy

0 %


Angry

Angry

0 %


Surprise

Surprise

0 %

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments