Wednesday, September 22, 2021
0 0
Homeমধ্যপ্রাচ্যমিসর, মুরসি ও সিসি : মার্কিন রাষ্ট্রদূতের চোখে শেষ দৃশ্য

মিসর, মুরসি ও সিসি : মার্কিন রাষ্ট্রদূতের চোখে শেষ দৃশ্য

Read Time:15 Minute, 1 Second

সিসি মুরসির বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের জুলাই মাসে অভ্যুত্থান করেন
সিসি মুরসির বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের জুলাই মাসে অভ্যুত্থান করেন
আল জাজিরা আরবি:
মিসরের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া বিপ্লবের সাড়ে পাঁচ বছর পর কায়রোতে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত আন প্যাটারসন ওয়াশিংটনে এক আলোচনা সভায় বসেছিলেন, সে অভিজ্ঞতার শিক্ষণীয় দিকগুলো আলোচনা করার জন্য।
প্যাটারসন প্রথমেই যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন নীতি স্পষ্ট করেন, আর তা হচ্ছে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক। অর্থাৎ ওয়াশিংটন প্রথমেই মিসরে এমন অবস্থা নিশ্চিত করতে চায়, যা দখলদার রাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না।
সাবেক রাষ্ট্রদূত বলেন “মিসরে আমাদের নীতি খুবই স্পষ্ট ছিল, এতে কোন দ্বিধা ছিল না।” তিনি আরো যোগ করেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দিক ছিল ইসরায়েলের সাথে মিসরের সম্পর্ক। আর এই নীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ঘোষিত অন্য কোন নীতির সাথে বিরোধপূর্ণ হলে এই নীতিই অগ্রাধিকার পেতো। যেমন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সহযোগীতা করার নীতির কথা বলা যেতে পারে।
এই সুস্পষ্ট স্ট্রাটেজি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পয়েন্টের একটি, মিসর সম্পর্কে প্যাটারসনের পুরো আলোচনা বুঝতে হলে যেগুলো প্রথমে বুঝতে হবে। গত বৃহষ্পতিবারে সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেস কর্তৃক আয়োজিত “আট বছর পর আরব বিদ্রোহ” শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব আলোচনা করেন।
সাবেক এই মার্কিন রাষ্ট্রদূতের আলোচনার দ্বিতীয় পয়েন্টটি মিসরীয় সেনাবাহিনীর ভূমিকার সাথে সম্পৃক্ত।  তিনি বলেন, “হুসনি মোবারককে যে অপসারণ করেছিল, মুহাম্মাদ মুরসিকেও সেই অপসারণ করেছে।” সেই সাথে তিনি যোগ করেন, “কেউ যদি সিসিকে অপসারণ করে, তবে তা একমাত্র মিসরীয় সেনাবাহিনীই করবে।” এরপর তিনি বলেন, “এটি কোন গণতান্ত্রিক কার্যক্রম ছিল না।”
তৃতীয়  পয়েন্টটি হলো পাশ্চাত্যের ভূমিকা সম্পর্কে। রাষ্ট্রদূত বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কিছু শক্তি গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ফলে যে ‘অপ্রিয়’ ফলাফল হতে পারে, সেটিকে গুরুত্ব দেয়নি।’ অপ্রিয় দ্বারা মূলত ১৫ জানুয়ারি ২০১১ সালের বিপ্লবের পর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ইখওয়ানের উত্থানের দিকে ইঙ্গিত করেন তিনি।
প্যাটারসন আরো বলেন, “শুরু থেকেই এটা স্পষ্ট ছিল যে ইখওয়ান নির্বাচনে ভালো করবে।” সালাফি আন্দোলনের উত্থানের ফলে অনেকের বিস্ময়ের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি এ কথাটি বলেন।
এরপর রাষ্ট্রদূত মার্কিন “অনুসঙ্গসমূহ” সম্পর্কে এবং এগুলো কীভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন রক্ষা করতে এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আবদুল ফাত্তাহ সিসির অভ্যুত্থান ঠেকাতে ব্যর্থ হলো, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। রাষ্ট্রদূত তার আলোচনায় এটিকে অভ্যুত্থান বলতে দ্বিধাবোধ করেন নি।  

হারিয়ে যাওয়া উপসাগরীয় পর্ব:

মার্কিন এই কূটনীতিবিদ বলেন, অভ্যুত্থানের ফলে মার্কিন উদ্দেশ্য শতভাগ পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও মুরসিকে অপসারণের বিষয়ে উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহের ভূমিকা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের নিকট মারাত্মক “তথ্য বৈসাদৃশ্য” (ইনফর্ম্যাশন গ্যাপ) ছিল। এছাড়াও তিনি ইঙ্গিত করেন যে, সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে এই অভ্যুত্থানে সালাফিদের ভূমিকা মার্কিনদের নিকট স্পষ্ট ছিল না।
প্যাটার্সনের বক্তব্যে অভ্যুত্থানে উপসাগরীয় অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া ভূমিকার কথা উত্থিত হয়, ওয়াশিংটনের নিকট এসকল দেশ নিছক দর্শকের ভূমিকায় ছিল এমন একটা চিত্র ফুটে ওঠে, সেই সাথে সেই কঠিন দিনসমূহে যা হচ্ছিল, সে সম্পর্কে অনেক প্রশ্নও উত্থাপিত হয়। সম্ভবত অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর অন্যান্য মার্কিন সূত্রে বর্ণিত বিভিন্ন কথোপকথন ও বিভিন্ন দলিলে প্রকাশিত হয়েছে।
আর এই বিষয়ে সবচেয়ে বড় মার্কিন দলিল সম্ভবত মার্কিন সাংবাদিক ডেভিড কিরকপ্যাট্রিক রচিত “Into the Hands of Soldiers… … Freedom and Chaos in Egypt and the Middle East” গ্রন্থটি। এই বইটির সারসংক্ষেপ নিউ ইয়র্ক টাইমসে ২০১৮ সালের জুলাই মাসের ২৭ তারিখ প্রকাশিত হয়।
ডেভিড কিরকপ্যাট্রিক তার বইয়ে যেসকল দলিল ও তথ্য-প্রমাণাদি সংকলন করেছেন, সেগুলোর আলোকে প্যাটরসনের অভিজ্ঞতা পাঠ করলে অনেকগুলো উপসংহারে উপনীত হওয়া সম্ভব। তন্মধ্যে একটা হলো, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা “আরব বিশ্বে গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতার পালাবদল”র পক্ষে তার অবস্থান সম্পর্কে দৃঢ়তা প্রকাশ করলেও তার প্রশাসনে দায়িত্বশীলগণ ছিল বিভিন্ন অঙ্গনের, আর তাই ২০১৩ সালে মিসরে তারা অভিন্ন লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করেনি।
কিরকপ্যাট্রিক তার বইয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী চাক হ্যাগেলের বিষয়ে দলিল উপস্থাপন করেন। বিভিন্ন সূত্র অনুসারে জানা যায়, রিপাবলিকান দলের প্রবীণ এই নেতা, যিনি ওবামার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন, তিনিও তার রাষ্ট্রপতির লক্ষ্য অনুসারে কাজ করেন নি।
দুই হাজার ষোল সালে মার্কিন সাংবাদিককে হেগেল তার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, প্রেসিডেন্ট মুরসির বিরুদ্ধে তার নিকট সৌদি, ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের নিকট থেকে অভিযোগ আসে। সাবেক এই মন্ত্রী আরো বলেন, আমিরাতের “ডি ফ্যাক্টো শাসক” আবু ধাবির যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন যায়েদ ইখওয়ান সম্পর্কে বলেন, “আমাদের এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যেঘাপটি মেরে বসে থাকা সবচেয়ে ভংঙ্কর বিপদ হচ্ছে ইখওয়ানুল মুসলিমন।”
কাজেই, মিসরের অভ্যুত্থানে সৌদি ও আমিরাতের ভূমিকা সম্পর্কে আমেরিকাকোন কিছু না জাানাটা অস্বাভাবিক, সাবেক রাষ্ট্রদূত যেমনটা দাবি করেছেন তার সর্বশেষ বক্তব্যে। বিশেষত যখন জানা যায় যে, সেখানে কতিপয় মার্কিন দায়িত্বশীল এবং মুহাম্মাদ বিন যায়েদের মতো ব্যক্তিত্ব ও ইসরায়েলের মতো একটি পক্ষের যৌথ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল।  
এসকল মার্কিন দায়িত্বশীলদের মধ্যে আছেন জেনারেল মাইকের ফ্লিন, যিনি সে সময় মার্কিন প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংবাদ এজেন্সির প্রধান ছিলেন, এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী ক্যাম্পেইন ও রাশিয়ার মধ্যকার অনুমিত গোপন চুক্তির বিষয়ে প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি।
অভ্যুত্থানের কয়েক মাস আগে জেনারেল ফ্লিন মিসরের রাজধানী কায়রো সফর করেন, মিসরীয় জেনারেলদের সাথে মুরসির বিষয়ে কথা বলার উদ্দেশ্যে। কিরকপ্যাট্রিক বলেন, জেনারেল ফ্লিন ২০১৬ সালে তাকে জানিয়েছিলেন যে ইখওয়ানুল মুসলিমীন আর আল কায়েদা “একই আদর্শ”র অনুসারী।

মুরসির প্রতি মার্কিন বিদ্বেষ:

এমনকি বেসামরিক মার্কিন দায়িত্বশীলদের মধ্যেও অভ্যুত্থানের পক্ষে অবস্থান ও নিদর্শনাদি বিদ্যমান ছিল। এর মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরিও আছেন, যিনি রাষ্ট্রদূত প্যাটারসনের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ছিলেন।
জন কেরি ২০১৩ সালের মার্চে কায়রো সফর করেন, এবং মুরসি ও সিসির সাথে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেন। কিরকপ্যাট্রিক কর্তৃক সংকলিত তথ্য-উপাত্ত অনুসারে, দুটি সাক্ষাৎ ছিল ভিন্ন উদ্দেশ্যে। কেরি মিসরের সেসময়ের রাষ্ট্রপতিকে অপছন্দ করেন এবং তাকে মার্কিন সাহায্যের অনুপযুক্ত বলে বিবেচনা করেন।
কিন্তু তিনি সিসির সাথে সাক্ষাৎ শেষে সন্তুষ্টচিত্তে বেরিয়ে আসেন। কেরি সাংবাদিক কিরকপ্যাট্রিকের নিকট বর্ণনা করেন, সিসি সেদিন তাকে বলেছিলেন, “আমি আমার দেশকে অজ্ঞাত পরিস্থিতির দিকে ছেড়ে দেব না।” সেসময়েই মার্কিন মন্ত্রী বুঝতে পারেন যে মুরসির সময় শেষ হয়ে এসেছে।
আর যখন জন কেরির প্রতিনিধি আন প্যাটারসন কায়রোতে মিসরীয়দেরকে নির্বাচনের ফলাফলের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বলছিলেন, এবং ফলাফল জানা নেই এমন কোন আন্দোলনের দিকে এগুতে নিষেধ করেছিলেন, ঠিক সেই সময় প্রায় প্রতিদিন চাক হেগেল সিসির সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করছিলেন।
কিরকপ্যাট্রিক বলেন, হোয়াইট হাউস হেগেলকে সিসির সাথে কথা বলার জন্য এমন সব পয়েন্ট বাতলিয়ে দিচ্ছিল, যাতে সিসিকে এই মর্মে সতর্ক করা হয় যে মিসরে অভ্যুত্থান হলে ওয়াশিংটন কঠোর শাস্তি দেবে। কিন্তু হেগেল সিসির নিকট “সম্পূর্ণ” ভিন্ন বার্তা পৌছাচ্ছিলেন।

হটলাইন:

হটল সিসিকে বলেন, “আমি কায়রোতে বসবাস করি না, বরং আপনিই কায়রোতে বসবাস করেন। কাজেই আপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আপনারই, আপনার দেশ রক্ষা করার দায়িত্ব আপনারই।” আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মর্তা বলেন, হোয়াইট হাউস চাচ্ছিল, হেগেল যেন সিসিকে জানিয়ে দেন, “গণতন্ত্রই গুরুত্বপূর্ণ”, কিন্তু হেগেল যে বার্তা পাঠাচ্ছিলেন, তা হলো: “আমরা ভালো সম্পর্ক চাই।”
হয়তো হেগেল ও সিসির মধ্যকার গোপন হটলাইন সম্পর্কে প্যাটারসন জানতেন না, কিন্তু সর্বাবস্থায় তিনি সিসি সম্পর্কে তো জানতেন। আর এটা বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনের আলোচনায়ও স্পষ্টই বোঝা যায়।
প্যাটরসন মিসরের বর্তমান শাসক সিসি সম্পর্কে যা জানেন, তার সব কিছুই স্পষ্ট করেন নি, কিন্তু তিনি বলেছেন যে তিনি জানতেন মুরসি যখন সিসিকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নিযুক্ত করেছিলেন তখন তিনি যতটুকু চিবুতে পারেন, তার চেয়ে বড় গ্রাস গ্রহণ করতেন। আর তিনি এও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি কয়েক বার সিসির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।
রাষ্ট্রদূত মনে করততেন, এই ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা মুরসির নাই। মুরসি সম্পর্কে তিনি বলেন, “মুরসি কট্টর ইসলামপন্থী, এটা তার ভুল নয়, বরং তিনি কি করেছিলেন, তা তিনি ভালোভাবে জানতেন না। আর যখন চাপ বৃদ্ধি পেতো, তখন ভেঙে পড়তেন, বিশেষত তার বিচ্ছিন্ন উপদেষ্টাদের কারণে। সত্যি বলতে কী, তার উপদেষ্টাদের অভিজ্ঞতার অভাব ছিল। মার্কিন প্রশাসনের অনেকেই তার প্রতি বিরক্ত ছিলেন, কারণ তিনি ছিলেন দাম্ভিক ও বিচ্ছিন্ন।
প্যাটারসন বলেন, “বর্তমানে এটি সুস্পষ্ট যে আরব বসন্ত ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এটি আরবের বাস্তবতা বদলে দিয়েছে।” (সংক্ষেপিত)
________________________________
প্রতিবেদনটি আল জাজিরা আরবিতেمصر والسيسي ومرسي.. المشهد الأخير بعين السفيرة الأميركية” শিরোনামে ১৭ ফ্রেব্রুয়ারি, ২০১৮ তারিখে প্রকাশিত হয়। ভাষান্তর কর্তৃক অনূদিত, ছবি আল জাজিরা থেকে সংগৃহীত।


Happy

Happy

0 %


Sad

Sad

0 %


Excited

Excited

0 %


Sleepy

Sleepy

0 %


Angry

Angry

0 %


Surprise

Surprise

0 %

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments