Wednesday, June 16, 2021
0 0
Homeশীর্ষ খবরনতুন নাগরিকত্ব বিল ও ভারতের “হিন্দুকরণ”

নতুন নাগরিকত্ব বিল ও ভারতের “হিন্দুকরণ”

Read Time:9 Minute, 57 Second

অপূর্বানন্দ, আল জাজিরা :

প্রস্তাবিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়নের কর্মীদের আন্দোলন । ছবি: রয়টার্স।

গত জানুয়ারির আট তারিখ ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষে অবৈধ অমুসলিম অভিবাসীদেরকে নাগরিকত্ব প্রদানের জন্য একটি বিল পাশ হয়েছে। এদিকে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তুমুল আন্দোলন চলছে। আন্দোলন হচ্ছে মূলত আসাম প্রদেশে, কারণ গতবছর সেখানে অসংখ্য নাগরিককে বিদেশি আখ্যা দিয়ে তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে।

বিতর্কিত নাগরিকত্ব (সংশোধিত) বিল ২০১৬, যেটি এখনো সংসদের উচ্চকক্ষে অনুমোদিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে, সেটিতে ১৯৫৫ সালের আইন সংশোধন করে পার্শ¦বর্তী মুসলিম দেশসমূহ (বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান) থেকে যে সকল হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, পারসিক, জৈন ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী অবৈধ অভিবাসী ভারতে প্রবেশ করেছেন, তাদেরকে ভারতীয় নাগরিকত্বের উপযুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে ২০১৪ সালের পূর্বে এসকল ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে যারা কোন ধরনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই ভারতে প্রবেশ করেছেন, তাদেরকে গ্রেফতার কিংবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে না, বরং ছয় বছর বসবাসের পর তারা স্থায়ী ভারতীয় নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন।
সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী এই আইনের উদ্দেশ্য হলো সে সকল মানুষের পাশে দাঁড়ানো, যারা তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিজ দেশে নির্যাতিত হয়েছেন এবং বর্তমানে ভারত ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা তাদের নেই। এই প্রস্তাবনায় ধারণা করা হয়েছে যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে মুসলমানদের নির্যাতিত হয়ে দেশ ছাড়ার কোন কারণ নাই, তাই সকল মুসলিম অভিবাসীদেরকে এই আইনের বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে যদিও আহমদিয়া ও শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন পাকিস্তানে ধারাবাহিকভাবে চরমপন্থীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে, কিন্তু তারা ভারতে শরণার্থী হতে পারবে না।

প্রস্তাবিত আইনটি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে কারণ এখানে ভারতের নাগরিকত্ব লাভের শর্তের মধ্যে ধর্মকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ভারতের কথিত ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রস্তাবিত আইনে শুধুমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশসমূহের সংখ্যালঘুদের জন্য সুযোগ রাখার পিছনের কারণ সম্পর্কে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন। অনেকেই বলছেন, শ্রীলংকা, নেপাল এবং বিশেষত মায়ানমার থেকে আগত হাজার হাজার অবৈধ অভিবাসীদেরকে এই প্রস্তাবনার বাইরে রাখা থেকে বুঝা যায় যে, ভারত সরকার অমুসলিম দেশের নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের সম্পর্কে মোটেও উদ্বিগ্ন নয়। 

বাস্তবতা হলো, মায়ানমারের মুসলিম রোহিঙ্গা সম্প্রদায় যখন তাদের ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ের কারণে নিজেদের মাতৃভূমিতে নির্যাতনের শিকার হয়ে ভারতে শরণার্থী হয়েছিলো, ভারত সরকার তখন তাদেরকে আইনী সুরক্ষা প্রদানের জন্য কোন পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি। উল্টো এসকল হতভাগ্য শরণার্থীকে দেশের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে তাদেরকে জোরপূর্বক দেশ থেকে বের করে দেওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলো। এই প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে প্রস্তাবিত আইনের পেছনে মানবতার দোহাই দিয়ে সত্যিকারের বিপদগ্রস্থ মানুষকে সহযোগিতা করার কারণটি আর ধোপে টেকে না। তাহলে ভারত সরকার এই প্রস্তাবিত আইনটি করার পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্যটা কী?

ভারতের বর্তমান সরকার দল হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপির উত্তরপূর্বাঞ্চলের প্রধান কৌশল নির্ধারক হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সম্প্রতি প্রস্তাবিত আইনের পেছনের আসল কারণটি স্বীকার করে নিয়েছেন, আর তা হলো ভারতের হিন্দু পরিচিতি রক্ষা করা। এই বিলের উপর নি¤œকক্ষে ভোটাভোটি হওয়ার পূর্বে শর্মা, যিনি আসামের অর্থমন্ত্রীও বটে, বলেছেন যে বিলটি যদি পাশ না হয়, তাহলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আসামে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। আর এরকম হলে যারা আসামকে আরেক কাশমির বানাতে চায়, অস্থিতিশীল করতে চায়, তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে।

নিম্নকক্ষে বিলটি পাশ হওয়ার পরপরই এই মন্ত্রী আবার বলেছেন, এ সিদ্ধান্ত আসামকে মুসলিমদের ১৭টি সংসদীয় আসন দখল ও এআইইউডিএফ প্রধান বদরুদ্দিন আজমলের মুখ্যমন্ত্রী হওয়া থেকে বাঁচাবে। আইন পাশের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে গিয়ে নির্বাচনে মুসলিম নাগরিকদের যাদের নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করার ও যে কোন পদে নির্বাচিত হওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে সাফল্য অর্জনের সম্ভাবনার কথা বলে উল্লেখ করে এ কথাটি স্পষ্ট করলেন যে কাউকে সহযোগিতা করার জন্য আইনটি পাশ করা হচ্ছে না, বরং ভারতে হিন্দু ধর্মের একচ্ছত্র প্রাধান্য রক্ষার জন্যই আইনটি পাশ করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ইতঃপূর্বে স্বীকার করেছিলেন ভারতকে এমন একটি হিন্দু জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ইচ্ছা থেকে প্রস্তাবিত আইনটি প্রণীত হয়েছে, যেখানে নাগরিকত্ব নির্বিশেষে সকল হিন্দুর অধিকারই প্রাধান্য পাবে, যেটি তার দলেরও ইচ্ছা বটে।

আসামের হিন্দু অধ্যুষিত শিলচর অঞ্চলে এক সভায় মোদি আরো বলেছিলেন, প্রস্তাবিত নাগরিকত্ব আইন হলো দেশবিভাগের অতীত ভুলের প্রায়শ্চিত্ত। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, তিনি বিশ্বাস করেন পাসপোর্টের রঙের চেয়ে রক্ত সম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মোদি এ অঞ্চলের বাংলাভাষী হিন্দুদেরকে প্রতিশ্রুতি দেন, এই আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদেরকে ভারত মাতা গ্রহণ করে নেবে ও স্বাগত জানাবে।

প্রস্তাবিত নাগরিকত্ব আইন আসলে বিজেপির বৃহৎ আদর্শিক ও রাজনৈতিক এজেন্ডা ভারতকে হিন্দুদের মাতৃভূমিতে রূপান্তরিত করার প্রচেষ্টার একটি অংশ মাত্র। ভারতের বর্তমান সরকারী দল বিশ্বাস করে যে ভারত হিন্দুদের, তারা ছাড়া অন্য সবাই আক্রমণকারী, অথবা বড়জোর পরবর্তীতে অনুপ্রবেশকারী। কাজেই তারা অতিথির মর্যাদা ছাড়া আর কিছুই আশা করতে পারেন না।

এই আইনের মাধ্যমে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসরত হিন্দু নাগরিকদের নিকট স্পষ্টভাবে এই বার্তা পৌছিয়ে দিতে চায় যে, তাদের শাসনামলে হিন্দুরাই সব সময় প্রথমে আসবে (অগ্রাধিকার পাবে)। একেবারে শুরু থেকেই বিজেপি এনআরসিকে বিবেচনা করছে দেশকে বিদেশি মুসলিম মুক্ত করার মাধ্যম হিসেবে। নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে তারা নিশ্চিত করতে চাচ্ছে যেন কোন হিন্দু এনআরসি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ না হয়, বরং কোন ধরনের জটিলতা ছাড়া শুধুমাত্র মুসলমানদেরকেই বিতাড়ন করা সম্ভব হয়।

প্রস্তাবিত আইনটি যদি সংসদের উচ্চকক্ষে অনুমোদিত হয়, তবে তা শুধু বিভেদ ও সংঘাতের কারণ হবে না, বরং ভারতের হিন্দুকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। (সংক্ষেপিত)

অপূর্বানন্দ: দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি ভাষার শিক্ষক।


Happy

Happy

0 %


Sad

Sad

0 %


Excited

Excited

0 %


Sleepy

Sleepy

0 %


Angry

Angry

0 %


Surprise

Surprise

0 %

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments